Year-18 # Issue-48 # 15 January 2012

তাবলীগে জামায়াতের বিশ্ব ইজতেমা
॥ জুলফিকার আহমদ॥
গত শুক্রবার ১৩ জানুয়ারি (২০১২ ইং) অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও ঢাকার টঙ্গীতে তাবলীগে জামায়াতের বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের লাখো মুমিন-মুসলমানের টঙ্গীতে সমাবেশ ঘটেছে। ইজতেমা শেষে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্যে সম্মিলিত মোনাজাত করা হয়। এই মোনাজাতে শরীক হবার জন্যে শেষদিন তুলনামূলকভাবে ইজতেমায় জনসংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। এবারও সেখানে লোকে লোকারণ্য হবার কথা।
কোন মহৎ আদর্শকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বাস্তবায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আদর্শিক কাজের সাথে জড়িতদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থতা। তাবলীগী জামায়াতের প্রতি দেশ-বিদেশে অগণিত মানুষের আগ্রহ-আকর্ষণের পেছনে এই গুণাবলীসমূহ বিশেষভাবে কাজ করছে। পেটের ধান্ধায় আজকের দিনের সদাব্যস্ত মানুষদের মধ্যে প্রায় দুর্লভ এসব গুণ সৃষ্টি করা কিংবা সৃষ্টি হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। তাবলীগী জামায়াতের নেতৃত্ব বৈষয়িক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্ণ নিরস ও শুষ্ক। তারপরও দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষকে এর প্রতি পিপাসু করে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। এই ফিতনার যুগেও এই মহান দ্বীনী প্রচারের ক্ষেত্রে মানুষকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এই সংগঠনের প্রথম আহবায়ক হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর এটি যে একটি উজ্জ্বল অবদান, নিঃসন্দেহে তা স্বীকার করতে হবে। অবিভক্ত ভারতে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনামলে সম্পর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে হযরত ইলিয়াস (রহ.) প্রথমে এ নিয়মের তাবলীগের কাজ শুরু করেন। ৬ উসূল ভিত্তিক তাঁর একাজ ইসলামের প্রাথমিক মৌলিক বিধানসমূহের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। তাবলীগ একজন মানুষের মধ্যে দ্বীনী কাজের প্রেরণা এবং অপর মানুষকে দ্বীনের দিকে নিয়ে আসার জন্যে যেই চারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টি করে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আজকের শোষিত-বঞ্চিত মানব সমাজে দ্বীনী পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নিপীড়ন দূর করে একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে এসব গুণের জুড়ি মিলে না। কিন্তু এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সমাজের যেই পরিমাণ মানষের মধ্যে উল্লিখিত গুণাবলী সৃষ্টি করে একটি দেশ ও সমাজকে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র ও পূর্ণ ইসলামী সমাজরূপে গড়ে তোলা যায়, এখনও সেই পরিমাণ লোক তৈরি হয়নি বলেই হয়তো মুসলিম বিশ্বে কাক্সিক্ষত সেই সমাজ ও শোষণমুক্ত ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না অথবা লোক তৈরি হলেও দ্বীনের দাবির ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিগত কোন পার্থক্যের কারণে সেটি হচ্ছে না। বলতে কি, সেটি না হওয়ায় ইসলামী খেলাফত বা ইসলামী হুকুমতের অভাবেই জীবনের সকল স্তরে, সমাজের সকল বিভাগে বেদ্বীনী শক্তির অপতৎপরতা প্রাধান্য পায়। ফলে মানব কল্যাণে আমাদের এ জাতীয় সকল বিরাট দ্বীনী কর্মতৎপরতা উক্ত লক্ষ্যবিন্দুতে পৌঁছতে আজ ব্যর্থ অবস্থায়, অথচ এ জন্যেই পৃথিবীতে নবী মোস্তফা (সা.)-এর আগমন ঘটেছিল। বলা বাহুল্য, ঐ লক্ষ্যটি হলো কুরআনের ভাষায় ‘এযহার-এ-দ্বীন’ ও ‘ইকামত-এ-দ্বীন’ অর্থাৎ আল্লাহর প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা ও ন্যায় বিধানকে মানুষের কল্যাণে মানব রচিত সকল বিধি-ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করা, যা সূরায়ে সাফ এবং অন্যান্য সূরায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাক্সময় হয়ে উঠেছে। ফলে মুসলিমদের কষ্টোপার্জিত অর্থ আল্লাহর দ্বীনের কাজের বদলে এবং মুসলমানদের বাঁচার অধিকার ও তাদের জীবনমান উন্নতকরণের কাজে ব্যয়িত না হয়ে সমাজের একশ্রেণীর চরিত্রহীন নেতৃত্বের ভোগ-বিলাসে ব্যয়িত হচ্ছে, অপচয় হয়ে যাচ্ছে তাদের স্বেচ্ছাচারী অন্য শয়তানি প্রবণতা ও অপর মুসলিম ভাইয়ের অধিকার হরণের হিংস্রতাপূর্ণ লড়াইয়ে। অবশ্য এক্ষেত্রে চলমান পরিস্থিতিতে তাবলীগের অনুসৃত নীতির বিষয়টিও একটি কারণ। কেননা দেশ, সমাজ গড়ার যে ৬টি সেক্টর (১) শিক্ষা, (২) অর্থ, (৩) প্রশাসন, (৪) বিচার বিভাগ, (৫) প্রচার মাধ্যম ও (৬) প্রতিরক্ষা। রাষ্ট্রীয় এই সেক্টরগুলো মহানবী (সা.) ও সাহাবীদের শাসন কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের অনুরূপ ইসলামী নেতৃত্বাধীন থাকলে দেশ-সমাজের অবস্থা কিছুতেই এ রকম হতো না। এজন্যে আমাদের মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের উপযুক্ত নজর দেয়া দরকার ছিল। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে নবী জীবনের অনুরূপ আদর্শ সমাজ বিনির্মাণকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সমাজ সংশোধনের উল্লিখিত ৬টি মহাগুরুত্বপূর্ণ সেক্টর পরিচালনার যোগ্য নেতৃত্ব মাদরাসায় সৃষ্টিকারী পাঠ্যনীতি অবলম্বন করলে এগুলো আজ অন্যদের হাতে গিয়ে সেখান থেকে এমন নেতৃত্ব তৈরি হতো না, যারা বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান-আস্থাকে সহ্য করতে পারে না। তদ্রুপ ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত ইসলামী আন্দোলনকারী উলামা-মাশায়েখদের ওপর জুলুম ও কারা নির্যাতন চালাতো না এবং নানান মিথ্যা অভিযোগে তাদেরকে আমজনতার কাছে বিভিন্নভাবে অপমানিত ও হেয় প্রতিপন্ন করতো না। এই তিক্ত পরিণতির এটাই দাবি যে, ঐসব মাদরাসায় কুরআন-হাদিসের সঙ্গে এমন সব বিষয়ও শিক্ষা দিতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় ঐ গুরুত্বপূর্ণ ৬টি সেক্টরে [(১) শিক্ষা বিভাগ, (২) অর্থ বিভাগ, (৩) আইন আদালত বিচার বিভাগ, (৪) শাসন বিভাগ, (৫) প্রচার মাধ্যম, (৬) প্রতিরক্ষা]  মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের ন্যায় তাদের আদর্শে নাগরিকদের গড়ে তুলতে পারে। তা না হওয়াতে ফল হয়েছে এই যে, দেশের ঐ শ্রেণীর মাদরাসাসমূহ ওয়াজ-নসীহতের বড় মাহফিল, তাবলীগের টঙ্গীর মতো লাখ লাখ মানুষের ইজতেমা এবং পীর-মাশায়েখ ও মসজিদসমূহে যত ওয়াজ-নসীহত হয়, সবকিছুর প্রভাব রাষ্ট্রীয় ঐ ৬ বিভাগের ছিদ্রপথ দিয়ে এমনভাবে দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যে, তখন দেশের সকল ইসলামপন্থী দল একত্রিত হয়েও তার কোন প্রতিকার করতে পারে না। এজন্যে ইসলামের এবং দ্বীনের যেই মহা ক্ষতি হয়ে আসছে, কাল-কেয়ামতের দিন যদি সংশ্লিষ্ট সকল ইসলামপন্থীকে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করেন যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.) কি জাতি ও সমাজ গঠনের রাষ্ট্রীয় ঐ ৬টি বিভাগ আবু লাহাব, আবু জাহল চরিত্রের লোকদের নেতৃত্ব ও পরিচালনাধীন ছেড়ে দিয়ে আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী (রা.) প্রমুখকে নিয়ে শুধু মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ এবং ওয়াজ নসীহত ও দাওয়াতী কাজেই ব্যস্ত ছিলেন? যদি তাই না হয়, তাহলে তোমরা কেন নবীর তরিকা পরিহার করে ঐগুলো অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়ে রেখেছিলে? তোমাদের মাদরাসা ও তাবলীগ জামায়াতে সেসব পদের উপযোগী ইসলামী নেতা পরিচালক সৃষ্টির উপযোগী শিক্ষানীতি ও কর্মসূচি কেন তৈরি করেনি? তখন সংশ্লিষ্টদের কোন জবাব থাকবে কি? তাবলীগ বা দ্বীনী দাওয়াতের দায়িত্ব মুসলমানদের ওপর একাধিক আয়াত ও একাধিক হাদীসের দ্বারা অর্পিত। তন্মধ্যে বিখ্যাত আয়াতটি হলো-‘তা’মুরুনা বিল মারূফে ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকার,- ‘‘তোমরা কল্যাণের দিকে মানুষকে নির্দেশ করবে আর মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে তাদের বিরত রাখবে।’’ এছাড়া পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আরও সরাসরি বলেছেন, ‘বাল্লিগ মা উনযিলা ইলাইকা’ -‘তোমার কাছে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অপরের কাছে পৌঁছাও।’ বস্তুত এ আয়াত এবং এ জাতীয় আরও যেসব আয়াত ও মহানবীর (সা.) হাদীসের নির্দেশের ভিত্তিতে যুগে যুগে মুসলমানরা তাবলীগ বা ইসলামী দাওয়াতের কাজ করেছেন, পালন করেছেন দ্বীন প্রচার ও বিশ্বময় ইসলাম বিস্তারের দায়িত্ব, তাঁরা দ্বীনকে খন্ডিতভাবে না দেখে একে পরিপূর্ণ আকারেই দেখেছেন এবং পরিপূর্ণভাবেই বিশ্বের মানুষের সামনে তুলে ধরে মানব সমাজে এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। ইসলামকে খন্ডিতভাবে যারা দেখেছিল, তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা কি আমার বিধান গ্রন্থের কিছু অংশ বিশ্বাস করো আর কিছুকে অবিশ্বাস করো? আল্লাহ অন্যত্র আরও বলেছেন, ‘তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো।’ আরও ইরশাদ হয়েছে, মাইয়াবতাগী গায়রাল ইসলামে দ্বীনান ফালাই ইউকবাল-‘যারা জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু অনুসন্ধান করে, তা কখনও গ্রহণ করা হবে না।’ সেই হিসেবে বুঝা যায়, দ্বীনের কতিপয় হুকুম  সংক্রান্ত দায়িত্ব মুসলমানদের স্কন্ধ থেকে দূর হবে না বরং পুরো কুরআনে যা কিছু সবগুলোর তাবলীগ এবং এগুলোর হুকুমই ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠার তাবলীগ অন্তর্ভুক্ত। এটা এজন্যে যে, আমরা যখন নামাজ আদায় করি, তখন নামাযের আয়াতের ওপর আমল করা হলো, যখন যাকাত দেই, যাকাতের আয়াতের উপর আমল হলো, তেমনি যখন রোযা রাখি, রোযার আয়াতের ওপর আমল করা হলো, যখন হজ্জ করি এ সংক্রান্ত আয়াতের ওপর আমল আদায় হলো। কিন্তু কুরআন মজীদে এগুলো ছাড়া আহকাম-এ-তা’যিরিয়া (ঈৎরসরহধষ খধ)ি বা অপরাধ দন্ডবিধি প্রয়োগ সংক্রান্ত কিংবা অর্থনৈতিক ও শোষণের যেসব আহকাম আছে, যেমন সমাজে, রাষ্ট্রের পুরুষ-নারী, চোর-ডাকাতের হাতকাটা এবং জেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত এ জাতীয় পুরুষ ও নারী অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দান, সে সংক্রান্ত বিধানসমূহ যদি জারির কথা তাবলীগী দাওয়াতে ও প্রচার কর্মসূচিতে না থাকে- আবার থাকলেও সে অনুযায়ী এসব খোদায়ী আইন প্রয়োগের জন্যে যেই আইনগত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আছে, সেখানে তাদের প্রশিক্ষিতরা না গিয়ে, না বসে এসব আইন কার্যকর করা না হয়, তাহলে কি করে আল্লাহর এই সংক্রান্ত আয়াতসমূহের উপর আমল হবে? তেঁতুলের বীজ বপন করে কি ফজলি আমের আশা করা যায়? তা না করে কেয়ামত পর্যন্ত এসব আয়াতের হয়তো তিলাওয়াতই হবে, এগুলোর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর আমল কোনো দিনই হবে না। এই জন্যে প্রিয় নবী (সা.) এবং তাঁর সুন্নাত ও আদর্শের অনুসারী উম্মত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে স্থান পেতে হলে মহানবীর পূর্ণ ইত্তেবা ও আল্লাহর কালামের ওপর পূর্ণ আমল ছাড়া গত্যন্তর নেই। আল্লাহ্ শেষ নবীকে উস্ওয়া বা উত্তম আদর্শ বলে কুরআনে ঘোষণা করেছেন। সেই উসওয়া বা আদর্শের অনুসরণ না করলে মুক্তি কিভাবে হবে? রাষ্ট্রীয় আইন সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ওপর আমল করতে হলে তা তার পূর্বশর্ত রাষ্ট্রীয় পদে যাবার সুন্নাতে নববী ও সুন্নাতে-সাহাবী মেনে চলতেই হবে। নিজেরা কোনো ‘‘মোসলেহাতে’’ না গেলেও এ জাতীয় কাজে অন্তত সমর্থন দিয়ে হলেও আল্লাহর নির্দেশ ‘‘সৎ কাজে সহযোগিতা করো’’-এর উপর আমল করতে হবে। এই সুমহান দায়িত্ব পালনে তাবলীগী জামায়াতে যেভাবে লোকদের নৈতিক গুণাবলীর প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তাদের মধ্যে ‘‘এখলাস’’ ‘‘ঈছার’’-কুরবানী’’ ও মেহনতের মনোভাব জাগিয়ে তোলা হয়, শোষণমুক্ত সমৃদ্ধ সমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এসব গুণ বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। তাবলীগ-এ-দ্বীনের পূর্ণ সফলতার চিন্তা স্বভাবতই আধুনিক মনমানসিকতাকে যেই বিষয়টির প্রতি নিয়ে যায়, সেটি হলো, আজকের দিনের ‘‘মারূফ’’ তথা ‘‘ভাল ও কল্যাণের’’ কাজের প্রসার দানের মাধ্যম ও ‘‘মুনকার’’ তথা মন্দ বা গর্হিত কাজের প্রসার দানের মিডিয়া শক্তি ও এর গতির প্রতি এ মহান দায়িত্বে নিয়োজিতদের তেমন ভ্রূক্ষেপ না দেয়া। যার ফলে একদিকে সমাজে এই মহৎ কাজ চললেও অপরদিকে তার লক্ষ্য বিরোধী কাজের প্রাধান্য ও দৌরাÍ্য দ্রুত বেড়েই চলেছে, যার ভয়াবহতা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাবলীগ জামায়াতের সম্মানিত মনীষীরা এদিকে দৃষ্টি দিলে বিরাট কল্যাণ হবে বলে অনেকে মনে করে। সমাজে আল্লাহর দ্বীনের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই তাবলীগ-এ-দ্বীন আবশ্যক। এ কাজের ইহজাগতিক ও পরকালীন ‘হাসানা’ বা সুফল পেতে হলে মন্দের প্রচারশক্তির চাইতে কল্যাণের প্রচারশক্তি আরও শক্তিশালী হওয়া ছাড়া দ্বীনী লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এদিকটিও এ যুগের তাবলীগ-এ-দ্বীনের দায়িত্বে নিয়োজিতদের বিচার বিবেচনায় থাকলে ভাল হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটাও মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাত অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় শক্তির আসনে যাওয়া ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। কেননা, মানব সমাজকে সুষ্ঠু পথে পরিচালনা, তাদের চিন্তা-চেতনা ও আকিদা বিশ্বাসের পরিবর্তন সাধন এবং সৎ ও মহৎ কাজে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার যেই কয়টি বলিষ্ঠ মাধ্যম আছে, তন্মধ্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, জনশিক্ষা, প্রচার মাধ্যম ও শাসন ব্যবস্থা সবগুলোর নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রকই থাকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। সেক্ষেত্রে এ তিনটি মস্তবড় মাধ্যমকে যদি উপেক্ষা করে তাবলীগী দায়িত্ব পালন করা হয়, তাহলে সেটি হবে অসম প্রতিযোগিতা। অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘‘তোমরা ‘মুনকার’-এর শক্তির প্রতি লক্ষ্য রেখে যথাসাধ্য নিজেদের প্রস্তুতি নাও।’’ এটা স্পষ্ট কথা যে, মারূফ তথা ভাল ও কল্যাণের প্রচারের গতি যদি ঘণ্টায় দশ মাইল হয় আর সে ক্ষেত্রে ‘মুনকার’ বা মন্দের প্রচারের গতি যদি হয় দশ হাজার মাইল, তখন এই দূরত্ব কি করে অতিক্রম করা যাবে? এই প্রস্তাবটি সামনে থাকলে আমার মনে হয় এ সংক্রান্ত অনেক সমস্যারই শুধু সমাধান হতো না, দ্বীনী তাবলীগের মূল লক্ষ্য অর্জনও বহুলাংশে ত্বরানি¦ত হতো।

শিল্প-বাণিজ্যের কিংবদন্তিকে হারাল দেশ
মোঃ আলমগীর হোসেন
ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাসের এক কিংবদন্তিকে হারাল দেশ। স্যামসন এইচ চৌধুরীর একজন আদর্শ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি তিনি ছিলেন ওষুধ শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের দিকপাল। এ শিল্প তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন এবং দেশের অন্যতম শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৩ সালে দেশে যে ওষুধ নীতি প্রণয়ন করে সেটাও স্যামসন এইচ চৌধুরীর অবদান। তিনি শুধু সফল শিল্পপতিই ছিলেনা,তিনি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ করদাতাও ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরীর মৃত্যুতে বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। গত ৫ জানুয়ারী’২০১২ বৃহস্পতিবা
র সকাল সোয়া ১০টায় বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরলোকগমন করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। স্যামসন এইচ চৌধুরীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদ ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। স্ত্রী অনীতা চৌধুরী, ৩ ছেলে স্যামুয়েল এস চৌধুরী, তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, একমাত্র মেয়ে রতœা চৌধুরী, নাতি-নাতনিসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। স্যামসন এইচ চৌধুরীর এই নামটিকে অনেকেই তাকে চেনেন ‘ব্যবসার জাদুকর’ হিসেবে। যে ব্যবসাতেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেই ব্যবসাতেই সোনা ফলেছে। দীর্ঘ ৫২ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি হার মানেননি কোন চ্যালেঞ্জের কাছেই। হঠাৎ বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে ৮৬ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। ব্যবসার এ কারিগর আরও কখনো ফিরবেন না আমাদের মাঝে। দেশের শিল্পোদ্যোগের ক্ষেত্রে আইকন হিসেবে পরিচিত এ ব্যক্তিত্ব হলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। সততা ও আদর্শের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সব চ্যালেঞ্জ জয় করে প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফার্মেসি থেকে গড়ে তুলেছেন স্কয়ারের মতো বিশাল এক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫২ সাল। স্যামসন এইচ চৌধুরী চাকরি করবেন না এমন দৃঢ়তায় একটি ফার্মেসির দোকান দিয়েছিলেন। কোন ব্যবসায়িক ধান্দায় নয়; ধুঁকতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে। প্রাণ বাঁচাতে অপরিহার্য অনেক ওষুধ তৈরি হতো না দেশে। তাই স্যামসনের দোকানদার হওয়া সাজে না; করতে হবে ওষুধ কারখানা। কিন্তু এত কি সহজ ছিল সেই সময়ে একটি বাঙালি তরুণের ওষুধ কারখানার মালিক হওয়া? আজকের মতো ইন্টারনেট নেই, পিচঢালা রাস্তা নেই, বড় ভবন নেই, চাইলেই তথ্য মেলে না। সে এক অদ্ভুত সময়। এ সময়টা কী করে নিজের করে নিয়েছিলেন স্যামসন? বিভিন্ন সময়ে তার বয়ানে তা উঠে এসেছে। বাবা ই এইচ চৌধুরীকে বললেন ফার্মেসি করবেন। বাবা রাজি অতঃপর পাবনার আতাইকুলায় একটি ফার্মেসি হলো। এলাকায় তখন ডাক্তার রশীদ বলে সদ্য পাস করা একজন রোগী দেখতেন। এ ডাক্তার স্যামসনের বন্ধু। গ্রামে প্রতি সপ্তাহে হাট বসে। ডাক্তার রশীদকে হাটের দিন নিজের ফার্মেসিতে বসতে অনুরোধ করলে রাজি হন তিনি। সারাদিন রোগী দেখেন, খাওয়া-দাওয়া করেন, তাসটাস খেলে চলে যেতেন। ওই সময়েই পাবনায় একজন ফার্মাসিস্ট ছিলেন। ম্যালেরিয়ার ওষুধ বিক্রি করতেন। ১৯৪৭ সালে এ ফার্মাসিস্ট দেশ ত্যাগ করেন। তার জায়গা কিনে নিলেন একজন, যিনি পরে ওষুধ কোম্পানি এডরুকের মালিক হয়েছিলেন। মূলত এ কোম্পানিই তরুণ স্যামসনের বুকের ভেতর লেপ্টে থাকা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে উসকে দিয়েছিল। ১৫ হাজার টাকা সম্বল। ছোট্ট একটা জায়গা ভাড়া নিয়ে বন্ধুদের নিয়ে কারখানা তৈরি করলেন। মিক্সচার সিরাপ, আর কিছু ট্যাবলেট বানানো হতো এখানে। প্রথম দিকে কোন ঝাড়ুদার ছিল না। নিজেরাই নিজেদের কারখানা ঝাড়ু দিতেন প্রতিদিন। তিন বছর পর কোম্পানির পুঁজি দাঁড়াল ৮০ হাজার টাকা। যাত্রা শুরুর চার বছরে মুনাফার মুখ দেখে স্যামসনদের স্কয়ার। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ঢাকায় ইত্তেফাক মোড়ের কাছে স্কয়ারের নতুন অফিসের কাজ শুরু হলো। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করাটা আজকের মতোই কঠিন ছিল। এরপর ধীরে ধীরে ফলবতী স্কয়ার বড় হতে থাকল। সঙ্গে স্যামসনের ভাবনাও প্রসারিত। স্কয়ার শেয়ারবাজারে এল। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে দেশের সর্বোচ্চ করদাতাদের একজন। মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি তা-ই ছিলেন। এমন নয় যে, তিনি দেশের সেরা ধনী। ওষুধশিল্পের আজকের অবস্থানের পেছনে স্যামসন চৌধুরীর ভূমিকা অসামান্য। শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানকে সেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেননি, এ খাতকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছেন। যখন ওষুধ নীতি করা হয়, তখন লেগে থেকেছেন একটি শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন যেন হয়। তার বিদায়ে ওষুধশিল্প অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকিং খাতের কাছে জিম্মি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি
মো. রেজাউর রহিম 
সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা প্রত্যাহারে ব্যাংকিং খাতের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। ফলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রফতানি খাতে বিপর্যয়ের আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার জারি করে শিল্প খাতের ঋণের সুদ হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নিয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে হারে সুদ ধার্য করবে তা মেনে নিয়েই উদ্যোক্তাদের ঋণ নিতে হবে এবং ব্যাংকগুলোর শর্ত মেনে নিতে হবে বিনিয়োগকারীদের। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে একটি সার্কুলার জারির মাধ্যমে সকল তফসিলি ব্যাংককে এ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রি-শিপমেন্ট রফতানি ঋণ ও কৃষি ঋণ ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যাংক ঋণের ওপর সুদ হারের ঊর্ধ্বসীমা প্রত্যাহার করা হলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আরেক দফা ব্যাংকিং খাতের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ল। সুদ হারের সীমা তুলে নেয়ার এ সিদ্ধান্ত মোটেই যথাযথ হয়নি বলেও মনে করেন তারা।  সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বাজেট সাপোর্ট বিষয়ক ১শ’ কোটি ডলার ঋণ পেতে, তাদের চাপে ঋণের সর্বোচ্চ হার তুলে দেয়া হয়েছে। ফলে দেশের মানুষকে আরো মুদ্রাস্ফীতির চাপে ফেলা হলো বলেও মনে করেন তারা। জানা গেছে, এর আগে গত ৯ মার্চ শিল্প খাতের ঋণের সুদ হারের সীমা তুলে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে কৃষি ও মেয়াদী ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদ হার ১৩ শতাংশ, চাল, চিনি, গম, ভোজ্যতেল, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদ হার ছিল সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ । এর মাধ্যমে ৯ মাস পর ঋণের সর্বোচ্চ সীমা প্রত্যাহার করে নিলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঋণের সুদ হার উš§ুক্ত করার ফলে ব্যাংকগুলো বেপরোয়াভাবে শিল্প ও আমদানি ঋণে লাগামহীন সুদ আরোপ করবে। এতে ব্যাংকের আয় বাড়লেও উচ্চ হারের সুদ ও সার্ভিস চার্জের কারণে শিল্প খাত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এদিকে, শুধু ব্যাংকিং খাত নয় গোটা অর্থব্যবস্থার অভিভাবক এবং বিচারক হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে সেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। জানা গেছে, সুদ ও সার্ভিস চার্জ নিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে চলছে চরম অরাজকতা। উচ্চ হারের সুদের কারণে উদ্যোক্তারা দিন দিন দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়ছে সাধারণ কৃষক থেকে ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা। শিল্পপ্রতিষ্ঠান রুগ্ন হওয়ার জন্য যেমন ব্যাংকগুলো দায়ী, ঠিক তেমনি দায়ী খেলাপি হওয়ার জন্যও। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ব্যাংক সুদ এবং সার্ভিস চার্জের কারণেই প্রতিবছর দেশে রুগ্নশিল্প বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে বাড়ছে ঋণ খেলাপির সংখ্যা। শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে ঋণের সুদ হারের সর্বোচ্চ সীমা বলে এখন আর কিছু থাকবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংক এবং ঋণগ্রহীতা মিলেই সুদ হার কত হবে তা নির্ধারণ করবে। এক্ষেত্রে শতভাগ কিংবা তার চেয়েও বেশি সুদ হার ধার্য হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহী অনেক শিল্পোদ্যোক্তাই এখন পিছু হটতে শুরু করেছেন।  তারা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের কাছে এমনিতেই দেশের অর্থব্যবস্থা অনেকাংশে জিম্মি, তার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলে আশংকা তাদের। এছাড়া উচ্চ সুদের কবলে পড়ে দেশে রুগ্নশিল্পের তালিকাও আরো দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন চেম্বার ও এসোসিয়েশনের পক্ষ  থেকে ঋণের সুদ হার কমানোর দাবি দীর্ঘদিনের। আগামী বাজেট ঘোষণার আগে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমইএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের বাজেট প্রস্তাবনায়ও সুদ কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে আবার পিছুটান দিয়েছেন। এব্যাপারে দেশের প্রধান রফতানি খাত-পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারদের সংগঠন বিজিএমইএ’র দ্বিতীয় সহ-সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশ সময়’কে বলেন, এ মুহূর্তে পোশাকশিল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মন্দার কারণে দরপতন, এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদের বিষয়টিতো রয়েছেই। তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিক রাখতে হলে দেশের রফতানি বাণিজ্যে ঋণের সুদের ওপর ৫ শতাংশ ভর্তুকী প্রদান অথবা সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। অন্যদিকে, যারা ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ করেছেন তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল তা দূর হবে। 

সারাদেশে আরো ৪শ’ খাদ্যগুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে
আইএনবি, ঢাকা
দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নিরাপদ মজুত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ধারণ ক্ষমতা আগামী দু’বছরে ২২ লাখ এবং ২০২১ সাল নাগাদ ৩০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করতে নতুন ৪০৫টি খাদ্য গুদাম এবং সাইলো নির্মাণ করা হচ্ছে।  খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এসব গুদামের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ১৪০টির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। বাকী ২৬১টির মধ্যে ১৭০টির নির্মাণ কাজ আগামী ডিসেম্বর এবং অন্যগুলোর কাজ চলতি বছরের জুন নাগাদ শেষ হবে। মন্ত্রণালয় থেকে আরো জানানো হয়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে দেশের সরকারি খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ১৫ লাখ টন। প্রকৃত মজুত ক্ষমতা সাড়ে ১৪ লাখ টনের মতো। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার নিরিখে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে এ মজুত ক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়।এ পরিস্থিতিতে সরকার খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্যোগের অংশ হিসাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এক লাখ ১০ হাজার মে.টন ধারণক্ষমতার ১৪০টি গুদামের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়াও সারা দেশে এক লাখ ৩৫ হাজার মে.টন ধারণক্ষমতার ১৭০টি গুদাম নির্মাণের কাজ চলছে। চলতি বছরেই এসব গুদামের নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসাবে চট্টগ্রামের হালিশহরে ৮৪ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার নতুন ৯১টি খাদ্যগুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী জুনের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এর বাইরে  জাপানী সহায়তায় মংলাতে জেটিসহ ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি সাইলো নির্মাণ করা হচ্ছে। ভূমি উন্নয়ন, পুকুর খনন, সংযোগ সড়ক নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজ চলছে। পরামর্শক সংস্থা প্রকল্প এলাকা জরিপ, মাটি পরীক্ষা, পশুর নদীর চ্যানেল জরিপসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি বগুড়া জেলার শান্তাহারে ২৫ হাজার টনের মাল্টিস্টোরেড গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। জাইকা এ গুদাম নির্মাণে সহায়তা দিচ্ছে। চট্টগ্রামে এক লাখ টনের একটি সাইলো ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সাহয়তায় দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাইলো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণের জন্য সমীক্ষা কাজ চালানো হচ্ছে। আগামী জুনের মধ্যে সমীক্ষা কার্যক্রম শেষ হবে। এ সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আরো নতুন সাইলোর নির্মাণের কাজ হাতে নেয়া হবে। সাইলোগুলোর নির্মাণ কাজ ২০১৫ সালের জুনের মধ্যে শেষ হবে। বাংলাদেশ আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ সাইলো নির্মাণ করা হবে। এসব সাইলোর মোট ধারণক্ষমতা হবে ১০ লাখ মে.টন। এগুলো মুলত চাল সংরক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হবে। কমপক্ষে তিন বছর সংরক্ষণ করা যায় এমন ব্যবস্থা থাকবে এসব সাইলোতে। চাল বস্তায় সংরক্ষণ না করে এ সাইলোতে ঢেলে খোলা অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করা হবে। সেখান থেকে ৫০ কেজির চটের বস্তায় এবং ২ কেজি, ৩ কেজি ও ৫ কেজি পলিব্যাগে বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্থানীয় (এলএসডি)  গুদামে সরবরাহ করা হবে। এসব এলএসডি থেকে পলিব্যাগের চাল ভিজিডি, ভিজিএফ, ওএমএসসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ভোক্তাদের মাঝে বিতরণ করা হবে। এছাড়া ট্রাকের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা ওএমএস কর্মসূচির চাল সাইলো থেকে সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হবে। এ মন্ত্রণালয় জানায়, এ প্রকল্পের বিষয়ে আইডিএ থেকে এক মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে নারায়ণগঞ্জ সাইলো, নারায়ণগঞ্জ সিএসডি, আশুগঞ্জ সাইলো, খুলনা শহরের মহেশ্বরপাশায় বিদ্যমান পরিত্যক্ত স্টিল সাইলো, দিনাজপুর সিএসডি’র বিদ্যমান অব্যবহৃত ভূমিতে নির্মাণের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। প্রকল্পের পরামর্শক সংস্থা নিয়োগের কারিগরি এবং আর্থিক মূল্যায়ন কাজ শেষ করেছে। এ জন্য বিশ্বব্যাংক ৩’শ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২২শ’ কোটি টাকার সফট লোন দিচ্ছে।এছাড়া সরকারি খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিদ্যমান গুদামগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। এ জন্য ১৭ কোটি ২০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও সহায়ক অবকাঠামো পুন:নির্মাণ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ৬১টি কেন্দ্রের ১৫৮টি খাদ্যগুদাম সংস্কার ও আনুষঙ্গিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আরো জনানো হয়, আটার চাহিদা পুরণে বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি পদক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করতে ঢাকার পোস্তাগোলায় একটি আধুনিক ময়দাকল নির্মাণ করা হচ্ছে। এজন্য একটি খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে। ইতোপূর্বে এখানে একটি ময়দা মিল থাকলেও তা বিগত জোট সরকারের সময়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। ফলে এ বছরে খোলাবাজারে চালের সাথে আটা বিক্রির কর্মসূচি গ্রহণ করলে বেসরকারি আটা কল মালিকদের সহায়তায় সরকারি গুদামের গম সরবরাহ করে অর্থের বিনিময়ে আটা করে আনতে হয়েছে। এ ব্যাপারে  খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বর্তমান সরকার দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনা  গড়ে তুলতে বেশ কটি যুগান্তকরি পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদেেপর কারণে দেশে খাদ্য উৎপাদন অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্নতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সাথে সাথে সুষ্ঠুু খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফলে দেশে খাদ্যশস্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচীর মাধ্যমে অতিদরিদ্র দুস্থ, স্বল্পআয়ের জনগোষ্ঠী, মওসুমী অভাবগ্রস্ত (মঙ্গা) এলাকা ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে, সাশ্রয়ী মূল্যে ও ন্যয্যমূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করা হয়েছে। অবশ্য এজন্য সরকারের খাদ্যমজুদ ব্যবস্থা আরো উন্নত ও ধারন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, মজুদ ব্যবস্থা আরো উন্নত ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ইতোমধ্যে কার্যকর কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশে সরকারিভাবে খাদ্য মজুদের ধারণক্ষমতা  ৩০ লাখ  টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এসব কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, সরকারের এসব কর্মসূচী বাস্তবায়নের ফলে আগামী দুবছরে এ ক্ষমতা ২২ লাখ টনে উন্নীত হবে।

বিশ্ব অর্থনীতির বেহাল অবস্থা
মনির তালুকদার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সেভাবে গতি পাচ্ছে না। ঋণ সংকট, বাজেট ঘাটতি, বেকারত্ব, ব্যয় হ্রাস, পুঁজিবাজারে অস্থিরতাসহ নানান ঘটনায় স্থবির হয়ে পড়া পশ্চিমা অর্থনীতির টানাপোড়েনের প্রভাব পড়ছে ছোট-বড় সব দেশের অর্থনীতিতে।
জাপানও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে সাম্প্রতিককালে জাপান বেশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সুনামি ও ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলতে শুরু করেছে পরিশ্রমী জাতি হিসেবে পরিচিত ওই দেশটি। তবে জাপানের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির অমোঘ টালমাটাল অবস্থা।
পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির চরম এই সংকট থেকে উত্তরণ ও আরেকটি বিশ্ব মন্দা মোকাবিলায় বিশ্ব নেতাদের দৌড়ঝাঁপ চলছে নিরন্তর। নানাভাবে তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি এবং বিরোধী দলের যৌথ উদ্যোগও ঘাটতি কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারি ব্যয়-হ্রাসের উদ্যোগের বিরোধিতা জোরদার হচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। অন্যদিকে ইউরোপের আর্থিক সংকট এমন এক জায়গায় উপনীত হয়েছে যে, ইউরো-জোন ভেঙে যাওয়ার কথাও উঠেছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির এই বিপর্যয়ের জন্য ধনীদের দায়ী করে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন স্তরের লাখ লাখ মানুষ। পুঁজিবাদবিরোধী ওই আন্দোলনের শুরু খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তার পরও নানা কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে মাঠে নামছে লাখ লাখ ছাত্র-যুবক, শ্রমিক এবং নানা পেশার মানুষ। ওয়াল স্ট্রিটবিরোধী আন্দোলন হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত পাওয়া ওই গণআন্দোলন ক্রমেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। বিভিন্ন দেশের সরকার দমন-পীড়ন, গ্রেফতার এবং নির্যাতন করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামা লাখ লাখ জনগণকে রুখতে পারছে না। এরই মধ্যে আন্দোলনের বয়স তিন মাস হতে চলছে। ওই আন্দোলন শুরু হয়েছিল জুকোটি পার্ক থেকে। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ওয়াল স্ট্রিটের দখল নিতে না পারলেও ব্র“কলিন ব্রিজসহ নিউইয়র্কের বিভিন্ন রাস্তায় মিছিল করে আন্দোলনকারীরা। ওই সমগ্র আন্দোলনের একমাত্র ইতিবাচক সাধারণ স্লোগানটি হচ্ছে জনগণের ক্ষমতায়ন চাই এবং চাই প্রকৃত গণতন্ত্র।
সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে শুরু হওয়া ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাম্রাজ্যবাদের মূল আখড়া যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা, মাত্রা ছাড়ানো বেকারত্ব, ধনী-গরিবের সম্পদের আকাশ-পাতাল তারতম্য প্রভৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে দেশটির তরুণ সমাজ। তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বিশ্বের তথাকথিত বিভিন্ন উন্নত, গণতন্ত্রের ধ্বংজাধারী দেশে ওই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহ এবং রাজনীতির ওপর কর্পোরেট জগতের আধিপত্য নিরসনের দাবিতে এ আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বের আপামর সাধারণ জনগণের সমর্থন আদায়ে সফল হয়েছে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট ও বিভিন্ন দেশে এর সমগোত্রীয় আন্দোলনগুলো মূলত পরিচালিত হচ্ছে ছাত্র-যুব ও শ্রমিকসহ পেশাজীবী সমাজের প্রতিনিধিদের দ্বারা। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে সরকারের ব্যয় কমানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা চলছিল ঠিক তখনই ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ওই খবর প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কেন্দ্রীয় রাজস্ব বিভাগ জানিয়েছে, সরকারের অতিমাত্রায় ঋণ নেয়ার কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে মোট ১৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। মার্কিন সরকারের বর্তমান ঋণের পরিমাণ দেশটির ২০১১ সালের প্রক্ষেপিত মোট অর্থনীতির প্রায় ৯৯ শতাংশ। বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশটির ঋণ গ্রহণের এই উচ্চহারকে অত্যন্ত নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা। চলতি বছরের ২ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দেশটির ঋণের পরিমাণ ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি স্পর্শ করা সরকারি দল ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় দলের জন্য একটি বড় ধরনের আঘাত। কেননা উভয় দলের সমন্বয়ে গঠিত মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্যানেল যৌথভাবে সরকারের ব্যয় কমানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে। ঋণের পরিমাণ এমন এক সময় বেড়েছে যখন দেশটি চলতি বছরের ২৩ নভেম্বরের মধ্যে অচলাবস্থায় কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা করছিল। তবে প্রতি মাসে ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। গত দুই বছর দরে চলা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। একের পর এক সম্মেলন করেও কূলকিনারা করতে পারছে না ওই অঞ্চলের দেশগুলো। সম্মেলন শেষ হতে না হতেই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিচ্ছে। বিভিন্ন রকমের অর্থনৈতিক তত্ত্ব আমলে এনেও সামাল দেয়া যাচ্ছে না ওই ভয়াবহ বিপর্যয়। পুঁজিবাজার থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক অবস্থা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার স্থবির হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ইউরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে স্থবিরতা কাটেনি। অন্য দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার আগের চেয়ে কমে যাওয়ায় কিংবা কোনোটির নেতিবাচক হওয়ায় সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। গ্রিস আর ইতালির সংকটের মধ্যে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে। দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে তাড়িয়ে শক্তিশালীদের নিয়ে নতুন সূচনা, নাকি বিপদের মধ্যেও পরস্পরের প্রতি সংহতি বজায় রাখা উচিৎ। এ নিয়ে বিতর্ক তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ব্যয-হ্রাসের মাধ্যমে ২৭টি দেশের ওই জোট ২০১২ সালে এর লক্ষ্যমাত্রা ১৭৪ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে। যেটি ২০১১ অর্থবছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। ইইউ জোটের ঋণ সংকটের কারণে বড় আকারের ব্যয় কমানোর ওই পদক্ষেপকে কৃচ্ছ্র সাধন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে বাজেটে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সংকোচনের প্রস্তাব গত ২৬ অক্টোবর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে বাতিল হয়ে যায়। ভোটদাতাদের মধ্যে অনেকেই ব্যয় কমানোর ব্যাপারে ইইউর দেশগুলোকে বাধ্য করার বিপক্ষে ছিল যদিও অনেকেই বলেছিল এটা করা না গেলে এর জন্য উচ্চহারে ঋণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটে ২ শতাংশ বরাদ্দ বাড়ানো ছিল রাষ্ট্রগুলোর জন্য সর্বোচ্চ এবং এটাই হলো বাস্তবতা। তবে ওই ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খারাপ অর্থনীতির দেশগুলো সমস্যায় পড়তে পারে। বাড়তি ব্যয় নির্বাহের জন্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মনে করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা ইইউ পার্লামেন্ট ২০১২ সালৈ ১৩৩ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় করবে, যা ২০১১ সালের থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো বেশি। সম্প্রতি ইইউর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ অক্টোবর মাসে দাম বৃদ্ধির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইউরোপজুড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে আর ব্রিটেনে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ শতাংশ। একই সময়ে ইইউ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে ২০১২ সাল জুড়ে ইউরোপে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দেশেই সংকট আসে এবং কিছুকাল পর তা কেটে যায়। কিন্তু ইউরো অঞ্চলের সংকটের চূড়ান্ত সমাধান সূত্র যে কী, তা এখনো অজানা। গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল ও ইতালির মতো একেকটি দেশের সংকট কাটাতে বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চলছে। সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে এ অঞ্চলের নেতারা একমত হলেও তা বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত। কম-বেশি সাফল্য পেলেও সার্বিক সমাধান সূত্র দেখা যাচ্ছে না। আরো কতকাল ধরে জরুরি ভিত্তিতে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে যেতে হবে, এমন পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা ও ধৈর্যই বা কতদিন থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সর্বশেষ ইতালির মতো বড় অর্থনীতির দেশের সংকট সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলো। বর্তমানে ইউরোপ চাকরির বাজারে মন্দা শুরু হয়েছে। চলতি বছরে ইউরোপজুড়ে বেকারত্বের হার বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২১ শতাংশ তরুণ-তরুণীর এখন কোনো কাজ নেই। আফ্রিকার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভয়াবহ। উত্তর আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্বে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সাহারা মরুভূমি সন্নিহিত অঞ্চলকে সাহেল অঞ্চল বলে। ওই অঞ্চলের খাদ্য পরিস্থিতি আবার উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছেÑ সংবাদ সম্মেলনে অক্সফামের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপক এরিক হ্যাজার্ড ওই কথা বলেছেন। সাহেল অঞ্চলের ৫টি দেশ মৌরি তানিয়া, শাদ, মালি, নাইজার ও বারকিনা ফাসোর ৯০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হবে। ওই অঞ্চলের দেশগুলোর খাদ্যশস্যের ঘাটতি প্রায় ২৫ লাখ টন। গত বছরের তুলনায় শাদ ও মৌরি তানিয়ায় খাদ্য শস্যের উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই অবস্থায় নাইজারের প্রায় অর্ধেক মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে মারাÍক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অপরদিকে ওই সংকট সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও জিবুতির ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে অনাহারের ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিগত তিন মাসে পূর্ব আফ্রিকার ছোট দেশ সোমালিয়াতে দুর্ভিক্ষজনিত কারণে অনাহারে প্রায় ২৯ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। গোটা দেশে আরো প্রায় ১ লাখ শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। মোট ৭৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ সোমালিয়াতে ৩০ লাখের বেশি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজন ন্যূনতম দৈনিক খাদ্যের। তাছাড়া সাহেল অঞ্চলের অন্য দেশগুলো যেমন- সেনেগাল, দক্ষিণ আলজেরিয়া, উত্তর নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, দারফুর, উত্তর ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়ার মানুষ খাদ্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্তিন লাগার্দত্ত আরেকটি বিশ্ব মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইউরোপ ও আমেরিকা ঠিকমতো নিজেদের ঘর গোছাতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে আরো একটি বড় বিপর্যয়ের মধ্যে তলিয়ে যাবে পুরো বিশ্ব বলে সতর্ক করে দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। 

এক এগারোর জন্য দায়ী কে? 
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
মাঝে মাঝে বিশেষ করে ১/১১ এলে নানা ধরনের আলোচনা হয়। দাবি ওঠে যে ১/১১-এর নায়কদের তথা খলনায়কদের বিচার করা প্রয়োজন। বিএনপি সবচেয়ে বেশি সোচ্চার এবং তীব্র সমালোচক কারণ তারা মনে করে যে, তাদের সামনে থেকে বাড়া ভাতের থালা কেড়ে নেয়া হয়েছে। ছলে-বলে-কৌশলে ২০০৭-এর নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে হবেন এবং তাদের লোক হবেন এ কথা মাথায় রেখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়ে দেয়া হলো। এক কোটি জাল ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই জাল ভোট তৈরি করার জন্য কতোরকম নিষ্পেষণ করা হয়েছিল ভোটার নিবন্ধন অফিসারদের ওপর, তার একটি কাহিনী পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল। শেরেবাংলা নগর সরকারি বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এরকম কাজ করতে অস্বীকার করায় শুধু তিনি নন, তার গোটা পরিবারের ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল বিভিন্ন কায়দায় যেমনÑ শাস্তিমূলক বদলি। সর্বোপরি এমন একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন সে সময় যার আচার-আচরণ প্রচ-ভাবে বিতর্কমূলক এবং সন্দেহজনক। হ্যাঁ, ১/১১-তে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন তাদের বিচার হওয়া উচিত। তা উচিত বটে, তবে সেই সঙ্গে ’৭৫-এ এবং ’৮২-তে যারা জনগণের সরকারকে উৎখাত করেছিল তাদেরও তো বিচার হওয়া প্রয়োজন। অবশ্য ইতোমধ্যে মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক এসব সরকার অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্য যে, এই দুর্ঘটনার কুশীলবদের সঙ্গে কয়েকজন মাননীয় বিচারপতিও জড়িত। আইন সবার জন্য সমান। অতএব তাদেরও বিচার হওয়া উচিত বৈকি? প্রয়োজনবোধে মরণোত্তর বিচার হবে, মরণোত্তর পুরস্কার যদি দেয়া যায়, তাহলে বিচার করতে অসুবিধা কোথায়? এখন আসি ১/১১ প্রসঙ্গে। ১/১১ মানে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে সাবেক সিএসপি এবং বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ফখরুদ্দীন আহমদের ক্ষমতা গ্রহণের তারিখ। তিনি চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। আমরা ১/১১ বলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১-এর কায়দায়। অন্যথায় আমরা কিন্তু প্রথমে দিন, তারপর মাসের নাম বলি। সে হিসেবে আমাদের বলার কথা ১১/১। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন-উ-আহমেদ ছিলেন নেপথ্য নায়ক। যে জন্য ফখরুদ্দীনের সরকারকে বলা হয় সেনাসমর্থিত সরকার। আর ’৭৫ এবং ’৮২-তে এসেছিল সেনাদের সরকার। এবার আসি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে। বস্তুত ৪টি সংসদীয় নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। প্রথম নির্বাচনটি হয় ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সরকারের অধীনে। এটি সংবিধানের বিধি অনুযায়ী হয়নি কিন্তু সবকটি বিরোধী দলের সমঝোতার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জনাব সাহাবুদ্দীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য এবং কারচুপিবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তবে জামাতে ইসলামী বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সকলের প্রতি নিরপেক্ষ মনোভাব দেখানোর কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। সাহাবুদ্দীন সরকার আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রতি সমান দৃষ্টি দিয়েছিল। কিন্তু এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রতি সমদৃষ্টি দেয়া হয়নি। এক কথায় বলা চলে যে, জাতীয় পার্টির প্রতি প্রচ-ভাবে অবিচার করা হয়েছিল। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সন্নিবেশিত হওয়ার পর মোটামুটি নির্বিঘেœ ’৯৬ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালেই কিছু সমস্যা দেখা দিলো। এটুকু না ঘটলে নির্বাচনের ফলাফলে তেমন প্রভাব পড়তো না। কিন্তু এর ফলে যা প্রতিভাত হয়ে উঠলো, তাহলো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকেও কায়দা-কৌশল করে নিজের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় তিনজন ব্যক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা এবং চিফ ইলেকশন কমিশনার। ২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি সেই পথ লক্ষ্য করে চলতে লাগলো। রাষ্ট্রপতি তো তাদের খাস আদমি। প্রধান উপদেষ্টার জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের অবসর গ্রহণের বয়স বাড়ানো হলো। আর চিফ ইলেকশন কমিশনার হিসেবে যাকে নিয়োগ দেয়া হলো, তার কথা না বলাই ভালো। যখন বিএনপির ইপ্সিত ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করা গেলো না তখন রাষ্ট্রপতি নিজেই সেই পদ দখল করে বসলেন। ২০০৬ সালের ২৭/২৮ অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। তারপর আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলের ভেতর সংঘাত শুরু হয়ে যায়। অবশ্য ইতোমধ্যে উভয়পক্ষ জোট বেঁধেছে। তবে জেনারেল এরশাদ হয়ে দাঁড়ালেন ট্রাম্প কার্ড। তাকে দলে ভেড়ানোর জন্য উভয় নেত্রী প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেন। এরশাদকে অতীতের স্বৈরাচার আখ্যায় আখ্যায়িত করেছিলেন উভয় নেত্রী। কিন্তু নীতিহীন রাজনীতির কাছে সব ধুয়েমুছে যায়। শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেন শেখ হাসিনা। এরশাদ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোটে যোগ দিলেন। ২০০৬ সালে অক্টোবরের শেষভাগ থেকে ১১ জানুয়ারি ২০০৭ পর্যন্ত দেশের অবস্থা কেমন ছিল বিশেষ করে ঢাকা শহরের অবস্থা। গুলিস্তান-মতিঝিল দুটো সংগ্রামরত জোটের দখলে। এক অঞ্চলে দেখা যেতো গজারি কাঠের ডগায় ঝা-া বেঁধে উগ্রমূর্তি ধারণ করে একদল রাজনৈতিক কর্মী ঘোরাফেরা করছে। অপর অঞ্চলে লগিবৈঠা হাতে আরেক দল। জাতীয় জীবনে দেখা যায় আতঙ্ক এবং স্থবিরতা। চারজন উপদেষ্টা সমান সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করে ব্যর্থ হন এবং পদত্যাগ করলেন। আজ তাদের ভেতর একজন ইদানীং মিডিয়ার সামনে নানা কথা বলছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন। তবে তিনি বা তারা যে ব্যর্থ হলেন, সে ব্যাপারে খুব পরিষ্কার বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে তো প্রশ্ন করা যায় যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এ গ্যারান্টি কি দেয়া যায়? এখন যাই বলা হোক না কেন, ১১ তারিখে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল তাকে বিএনপি-জামাতের হার্ডকোর নেতাকর্মী ছাড়া দেশের আপামর জনসাধারণ স্বাগত জানিয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের ব্যর্থতার জন্য সে সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল, সেটা ভিন্ন কথা। এখন বলা হয়ে থাকে যে, তারা ৯০ দিনের বেশি ক্ষমতায় থেকে অবৈধ কাজ করেছে। এখানেও আমরা ভুল করছি। সংবিধানে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছি, এটি সেভাবে গঠিত হয়নি। ফলে তারা কারো কাছে দায়বদ্ধ নন। এখন বলা হয়ে থাকে যে, এরা অবৈধভাবে ক্ষমতায় ছিল। হয়তো হবে তাই, তবে এটা নতুন নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে অবৈধ ক্ষমতা দখলদারদের দ্বারা। কেউ তো এ প্রশ্ন তুলছেন না। সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সুশাসনের জন্য প্রয়োজন অনেক কিছুর। প্রথমেই প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের। স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এসব প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, চারটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসীন হলো। তারা উভয়েই প্রশাসনকে প্রবলভাবে দলীয়করণ করেছে। এটা কি কল্পনা করা যায় যে, স্বপদে বহাল থেকে নির্বাচনী প্রচার চালানো যায়। এই বাংলাদেশে তাও ঘটেছে। কর্মরত বিচারক নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য পূর্ব থেকে প্রচার চালিয়েছেন। এহেন পরিস্থিতিতে জনগণ ভেবেছিলেন যে, নতুন তত্ত্বাবধায়ক তাদের জন্য কিছু কল্যাণ করবে। তাতো হলো না। বরঞ্চ কিছু কিছু সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তানের মিলিটারি একাডেমি কাকুল সিনড্রমে প্রবাহিত হয়ে উল্টো-পাল্টা কাজ করে বসলেন। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। সেখানে সেনাক্যাম্প করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা করার ফলে একটা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেলো। আর যেটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং এটি কোনো অবস্থাতে মেনে নেয়া যায় না। তাহলো শিক্ষক-ছাত্রদের ওপর নির্যাতন। পাকিস্তানি গুরুদের কাছ থেকে নির্যাতন করার যে দীক্ষা সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা পেয়েছিলেন, তাদের ভেতর কয়েকজন সেই শিক্ষাকে কাজে লাগালেন। আমরা হতবাক হয়েছিলাম যে কিভাবে আমাদের সেনাবাহিনী তাদেরই আপনজনের ওপর এহেন মধ্যযুগীয় নির্যাতন চালাতে পারে।
এখানে আরো একটি কথা বলতে হয়, সিলেটের সন্তান আনোয়ার চৌধুরী ব্রিটিশ হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে আসেন। তার এক উত্তরসূরি এই মর্মে সাফাই গেয়েছেন যে, ১/১১-এর ঘটনাবলীর সঙ্গে আনোয়ার চৌধুরীর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তা হয়তো ছিল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনের সময় তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, এই আন্দোলন করার জন্য উস্কানি দেয়া হয়েছে। এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত, অজ্ঞাতপ্রসূত তো বটেই। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ছিলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পাকিস্তানের এলিট সিভিল সার্ভিসের সদস্য। ডক্টরেট তো বটে। এতোকিছুর পরও তার বিবেক শাণিত হয়নি অন্যায় এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য। তিনি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আমাদের বিষয় নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমেই সংঘাতের দিকে এগুচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত ইগো, অসহিষ্ণুতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা। আর রাজনীতিতে আর্থিক দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ রাজনীতি এখন শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্বজনপ্রীতি এবং পরিবারতন্ত্র শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি এশিয়া মহাদেশে ব্যাপক। ভারতের বিজেপি থেকে অটলবিহারি বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গর্বভরে বলেছিলেন যে, ভারতে পরিবারতন্ত্র শেষ হলো। কিন্তু তা হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, জোরেশোরে আবার পরিবারতন্ত্র ফিরে আসছে। শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাষ্ট্রপতির বড় অবদান যে, তিনি দীর্ঘদিনের তামিল সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়েছেন। কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি বোধহয় বড় বেশি প্রতিদান আদায় করছেন। তার ভাইসহ জ্ঞাতিগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ আসন দখল করে চলেছেন। শ্রীলঙ্কাবাসীকে আবার একদিন ভয়াবহ পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে হবে কিনা তা সময় বলে দেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিক সুশীল সমাজ সবাইকে অনুধাবন করতে হবে যে, ১/১১-এর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তারাই দায়ী। আর যেন সে পরিবেশ পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সজাগ থাকতে হবে। জনগণের সচেতনতা অনেক বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ এবং কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সে কথা মনে করে দেয়। কুমিল্লার রাজনীতিকরা জেলা পর্যায়ে যে সৌজন্য এবং দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তা এখন জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত হওয়া প্রয়োজন। দেশের তথা জনগণের কল্যাণ যদি সবার আন্তরিক লক্ষ্য হয় তাহলে তো কলহ করার অবকাশ থাকে না। হলিয়ার দ্যান দাউ, এই মানসিকতা সকলকে পরিহার করতে হবে। দেশপ্রেম ব্যক্তিগত বা দলগতভাবে কারোরই পেটেন্ট রাইট নয়, সে কথা সবার মনে রাখতে হবে। ভাষাও সেভাবে সংযত রাখতে হবে। অপরের ভুল ধরার আগে কিংবা তার সমালোচনা করার আগে নিজের চেহারা, নিজের অতীত নিয়ে একটু ভাবলে সবার জন্য মঙ্গল হবে।
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ : সাবেক ইপিসিএস ও কলামিস্ট।
বৃষ্টি ও পানি আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত
॥ মুহাম্মদ আবু মুনীর ॥
মাটি, পানি, আলো, বাতাস সবকিছুই মানুষের উপকারে এসে থাকে। পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগি করতে এসবের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এর একটিকে বাদ দিয়ে আমরা বেঁচে থাকতে পারি না। আর এসবের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন মহান স্রষ্টা আল্লাহ। পানি সাধারনতঃ নদী-সাগর, পুকুর ও মাটির নীচ থেকে পেয়ে থাকলেও বৃষ্টি পানির অন্যতম মাধ্যম। আর সরাসরি আল্লাহ নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার অন্যতম বৃষ্টি। শ্যামলীময় সুশোভিত বসুন্ধরা বৃষ্টির স্পর্শেই মানুষের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় ভূমিকে উর্বর ও উৎপাদনশীল করে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রকৃতি সজীবতায় ভরে ওঠে বৃষ্টির যাদুতে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে তদ্দারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে শুনে কাকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না” (সূরা বাকারা-২২)।
শান্তিময় পরিবেশ বজায় রাখতে আকাশ ও পৃথিবীকে সুশোভিত করা হয়েছে। বৃষ্টিকে শোভাবর্দ্ধন করতে কাজে লাগানো হয়ে থাকে। শোভাবর্দ্ধন কেবল নয় বরং আমাদের চাহিদা পুরনে বৃষ্টিপাতের ফলে খাদ্য-শস্য, ফুলে-ফলে ভরপুর করে দেওয়া হয় ভূ-মণ্ডলকে। গ্রীষ্মের তাপদাহ কিম্বা প্রচণ্ড খরায় শস্যক্ষেত যখন ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তখন একপশলা বৃষ্টি হলে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় পৃথিবীতে। এটি আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা তাদের সকল ক্ষমতা একত্রিত করেও একাজটি করতে পারেন না। অথচ আল্লাহর মর্জি হলে মুহুর্তের মধ্যে একটি দেশ, মহাদেশ কিম্বা পৃথিবীকে বৃষ্টির স্পর্শ বুলিয়ে দিতে পারেন। এমনকি প্রচুর বৃষ্টির কবলে ফেলে দেওয়ার কাজটিও করতে পারেন। একাজের প্রতিবন্ধকতা সৃৃষ্টির ক্ষমতা যেমন মানুষের নেই, তেমনি কাজটি করিয়ে দেখানোর সামান্যতম শক্তিও কারো দেওয়া হয়নি। সবই আল্লাহর নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। আধুনিক জ্যোতি বিজ্ঞানীদের মতে, আদিতে আকাশ, নক্ষত্র, সূর্য, পৃথিবী ইত্যাদির পৃথক পৃথক সত্তা ছিল না। তখন মহাবিশ্ব ছিল অসংখ্য গ্যাসীয় কণার সমষ্টি, যাকে বলা হয় নীহারিকা। এই নীহারিকা পরবর্তীতে বহু খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং এসব খণ্ড ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে নক্ষত্রপুঞ্জ, সূর্য, পৃথিবী ও অন্য গ্রহাদির সৃষ্টি হয়। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলী একসাথে থাকাকালে মানুষের বা প্রাণীকুলের বসবাসের উপযোগিতা ছিল না। জীব বিজ্ঞানীদের মতে, সাগরের অভ্যন্তরে অর্থাৎ পানিতেই প্রোটোপ্লাযম (জীবনের আদিম মূলীভূত উপাদান) হতেই জীবের সৃষ্টি। আবার যাবতীয় জীব-দেহ কোষ দ্বারা গঠিত এবং প্রত্যেকটি কোষের অন্যতম মূল উপাদান হচ্ছে পানি। ভিন্নমতে পানি অর্থ শুক্র। (কুরতুবী)। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে; তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?” (সূরা আম্বিয়া-৩০)। মানুষের বাসযোগ্য করে সৃষ্টি করা পৃথিবীতে মানুষের জন্য রুজির ব্যবস্থার পাশাপাশি কল্যানকর করে গড়ে তোলা হয়। আর বৃষ্টিপাতের ফলে সবকিছুকে করা হয় স্বাভাবিক। প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করতে সজীবতা ও সৌরভিত করা হয়। বিস্তীর্ণ মাঠ, গাছ-গাছালি, প্রাণিকুলের জীবনধারা ব্যাহত না হয় সেজন্য বৃষ্টি-পানির প্রয়োজন। এসব বিবেচনায় বৃষ্টিকে স্রষ্টার অপূর্ব দান ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। পবিত্র কুরআনের বাণী ‘আমি জলধর মেঘমালা থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করি, তদ্বারা উৎপন্ন করি শস্য উদ্ভিদ’ এই নেয়ামতের স্বাক্ষ্যবহন করে। আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টি, নদী-সাগর ও ভূগর্ভস্থ পানি না থাকলে পৃথিবীর কোন প্রাণি, গাছ-পালা কিছুই বেঁচে থাকতে পারতো না। আল্লাহর এই কুদরতে বিশ্বজাহান সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে আছে। বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিরাজি সমৃদ্ধ পৃথিবী তাঁর কুদরতি ইশারায় চলছে নিরবধি। পৃথিবীর গতিধারা প্রবাহিত হচ্ছে তাঁরই ইচ্ছায়।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তিনিই সমুদ্রকে অধীন করেছেন যাতে তোমরা তা হতে তাজা মৎস্যাহার করতে পারো এবং যাতে তা হতে আহরণ করতে পারো রতœাবলী যা তোমরা ভূষণরূপে পরিধান করো;------ এবং স্থাপন করেছেন নদ-নদী ও পথ যাতে তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারো” (সূরা নাহল-১৪ ও ১৫)। আল্লাহর নির্দেশেই সবকিছু হয়ে থাকে। মানব জাতিকে আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েÑআশরাফুল মাখলুকাত করে সৃষ্টি করেছেন। জগতের সবকিছুকে মানুষের উপকারে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ তাদের কর্তব্য-কর্মে স্বাভাবিকতা বজায় না রাখা এবং আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে ঐসব (জগতের সবকিছু) মানুষের সাথে বৈরী হয়ে ওঠে। মানুষের উপর নেমে আসে অরাজকতা, কষ্ট ও দুর্ভোগ। সৃষ্টিজগতের সবকিছু জ্ঞানবানদের জন্য শিক্ষার উপযোগি করে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন বিরাজমান। রাত-দিন, সমুদ্র-নদী, আকাশ-জমিন, ঝড়-বৃষ্টি, পশু-পাখি, গাছ-গাছালি, মেঘমালাসহ যত সৃষ্টি সবকিছুই আল্লাহর অসীম নিদর্শন। সবকিছুকেই আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এসব যেমন পৃথিবীকে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করে তেমনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিতেও কাজ করে থাকে। আধুনিক বিজ্ঞানে বৃষ্টিপাতের প্রাকৃতিক বর্ণনা দেওয়া হলেও তার মূলে আল্লাহর অদৃশ্য শক্তি রয়েছে একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। পবিত্র কুরআনে ভাসমান মেঘমালা থেকে বৃষ্টি বর্ষণের সুন্দর বর্ননা দেওয়া হয়েছে এভাবে, “তুমি কি দেখ না, আল্ল¬াহ সঞ্চালিত করেন মেঘমালাকে, তৎপর তাকে পুঞ্জীভূত করেন, অতঃপর তাকে স্তরে স্তরে রাখেন, অতঃপর তুমি দেখ যে, তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বারিধারা। তিনি আকাশস্থিত শিলাস্তুপ থেকে শিলাবর্ষণ করেন এবং তা দ্বারা যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন। তার বিদ্যুৎ ঝলক দৃষ্টিশক্তিকে যেন বিলীন করে দিতে চায়” (সূরা আন-নূর-৪৩)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ সাধন সত্ত্বেও বৃষ্টির বিকল্প আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। মাঠের ফসল, জমির উর্বরতা, গাছ-গাছালির সজীবতা, ফল-ফলাদির উৎপাদন, মাছ-জলজ প্রাণির প্রাণ চাঞ্চল্যতা, পশু-পাখির খাদ্য সংস্থানÑ সবকিছুই বৃষ্টিবর্ষণের ওপর নির্ভরতা বিরাজমান। এসব কিছুর সুষ্ঠু জীবন-যাপন এবং স্বাভাবিক অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টির প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন আল্লাহ। তবে স্বাভাবিক অবস্থার ব্যতিক্রম হলেই সহজাত প্রাকৃতিক ধারা ব্যাহত হয়। নেমে আসে দুর্যোগ-দুর্গতি। গাছ-গাছালি, ভূমি, পশু-পাখি, মানুষসহ সকল কিছুরই উপর পড়ে তার বিরূপ প্রভাব। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে, যা মানুষের হিত সাধন করে তাসহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযান সমুহে, আল্লাহ আকাশ হতে যে বারি বর্ষণ দ্বারা ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর র্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে যাবতীয় জীব-জন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য রয়েছে নিদর্শন” (সূরা বাকারা- ১৬৪)। আল্ল¬াহর রহমতের অনন্তধারা পৃথিবীতে না থাকলে মানুষ, জীব-জন্তু, গাছ-গাছালী কোন কিছুর উপযোগী বাস স্থান পাওয়া যেত না। পৃথিবীতে রয়েছে বেশুমার পানিরাশি। কিন্তু তার অধিকাংশই ব্যবহারের অনুপযোগি। লবণাক্ততা ও অন্যান্য দোষণমুক্ত মিষ্ট পানির প্রধান উৎস বৃষ্টি। স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হলে মিষ্টি পানির সংকট দেখা দিয়ে থাকে। পর্যাপ্ত মিষ্ট পানির অভাব ঘটলে পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন থমকে যাবে। অনাবৃষ্টির কারণে আমরা ভূগর্ভের পানি যথেচ্ছা ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সেটিও আমাদের জন্য হুমকি স্বরূপ। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “ক্ব ুল আরাআয়তুম ইন আসবাহা মায়ুকুম গয়রান ফামায় ইয়াতিকুম বিমায়িম মায়িন” অর্থাৎÑ‘বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি পানি ভূগর্ভে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, কে তোমাদেরকে এনে দেবে প্রবাহমান পানি!’ আল্লাহর দেয়া পানি আমরা প্রয়োজনে ব্যবহার করবো ঠিকই কিন্তু যথেচ্ছা ব্যবহার বা পানির অপচয় করা মোটেও উচিৎ হবে না। অপচয় করলে তার খেসারত দিতেই হবে। কোন কিছু অতি রঞ্জিত যেমন ঠিক নয়, তেমনি অহেতুক কিছু করাও ইসলাম সমর্থন করে না। পানি দূষিত করাও চরম অন্যায়। আমাদের মনে রাখা দরকার আমি যদি পানির অপচয় ও অপব্যবহার করি তাহলে অন্য কেউ বঞ্চিত হবে। আর এভাবে অপচয় ও অপব্যবহার হতে থাকলে এক সময় অনেকেই বঞ্চিত হবে। এজন্য আমাদের প্রিয় নবী (সা.) মুসলমানদের পারি দ্বারা পবিত্রতা হাছিলের কাজেও অপচয় করা থেকে নিষেধ করেছেন। রসূল (সা.)-এর সাহাবী সাদ ওযুর পানি ব্যবহারে অপচয় করছিলেন দেখে রসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, “তুমি পানি অপচয় করছ কেন? সাদ (রা.) বললেন, ওযুর সময়ও কি পানি অপচয় হয়? রসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ এমনকি যদি তুমি চলমান নদীতেও ওযু কর তাতেও পানির অপচয় হয়” (ইবনে মাজা)। এজন্য আল্ল¬াহর নেয়ামতরাজি উপভোগ করার পাশাপাশি যথাযথ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা আবশ্যক। বৃষ্টিও একটি নেয়ামত। এই নেয়ামত মানুষকে অপরিসীম দয়ার অধিকারী করেছে। আমরা সারাটি জীবন ধরে এই অমূল্য দানের প্রতিদান দিতে চেষ্টা করলেও সম্ভব হবে না। তাই আল্লাহর সকল নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর উপর সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা প্রয়োজন।

প্রাচীন মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ আধুনিক এক মানুষ
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
স্যামসন এইচ চৌধুরীকে প্রথম দেখি ষাটের দশকের শেষদিকে। আমার বাবা বিশিষ্ট আইনজ্ঞ দেবেশ ভট্টাচার্যথ পরে যিনি সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন, তার কাছে এসেছিলেন। তখন আইয়ুব-মোনায়েম খানের জমানা। বাঙালিরা নিষ্পেষিত। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ। শত্রু সম্পত্তি আইন বলবৎ রয়েছে। সংখ্যালঘুদের মনে প্রশ্ন, দেশে থাকা যাবে তো? এমনই একটি সময়ে স্যামসন চৌধুরী বাবার সঙ্গে আলোচনা করতেন বিনিয়োগ বিষয়ে। বাবারও বাঙালিদের ভষ্যিতের প্রতি গভীর আস্থা। তার দৃঢ় বিশ্বাস, পরিবর্তন আসবেই। এ জন্য যাদের দেখে ভরসা পেতেন তাদের মধ্যে ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। আশির দশকে শিল্পায়ন নিয়ে গবেষণা চালানোর সময় তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ বেড়ে যায়। খেলাপি ঋণের ইস্যুটি তখন ব্যাপক আলোচনায়। একদল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি। সংবাদপত্রে এ নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন বের হতে থাকে। এ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় স্যামসন চৌধুরীর শিল্প স্থাপন প্রচেষ্টা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ঋণখেলাপি না হয়েও যে বড় ধরনের শিল্প স্থাপন সম্ভবথ তিনি প্রমাণ করেন। আশি-নব্বইয়ের দশকে আরও একটি বিষয় আলোচনায় ছিল কর পরিশোধে অনাগ্রহ কিংবা ফাঁকি দেওয়া। কিন্তু স্যামসন চৌধুরীর স্কয়ার গ্রুপ বছরের পর বছর থেকেছে সর্বোচ্চ করদাতার তালিকায়। ইথিকস ইন বিজনেস নিয়ে বিশ্বব্যাপীই আলোচনা চলে। নীতি-নৈতিকতায় অবিচল থাকা যে সম্ভব এবং এটা করেও যে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা যায়, তিনি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ প্রসঙ্গে সিএসআর বা করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির কথাও বলা যায়। তিনি যখন তার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের জন্য দুপুরে বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন তখন বাংলাদেশে সিএসআর শব্দও কেউ শোনেনি। ব্যবসায়ের জন্য নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতাই ছিল প্রধান বিবেচ্য। তৃতীয় বিষয়টি আমি বলব শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে। আমরা দেখেছি, শেয়ারবাজার থেকে কেউ কেউ বিতর্কিত উপায়ে ফায়দা আদায় করেছেন। কেউ কেউ শেয়ার ছেড়ে অর্থ তোলার পরও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিনিয়োগ করেননি। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু স্যামসন চৌধুরী ব্যতিক্রম। তার প্রতিটি কোম্পানির ওপরেই ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের রয়েছে প্রগাঢ় আস্থা। চতুর্থ যে বিষয়টি আমি বলব, তিনি সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করে লাভবান হতে চাননি। সরকারের ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তার ছিল। কিন্তু সে পথে চলেননি। আশির দশকে বাংলাদেশে রফতানিমুখী শিল্প গড়ে উঠতে থাকে। তৈরি পোশাক শিল্প হয়ে ওঠে লাভজনক ব্যবসা। এতে বিপুল কর্মসংস্থানও হয়। কিন্তু স্যামসন চৌধুরী পোশাক শিল্পে বিনিয়োগে যাননি। তিনি সেসব শিল্প স্থাপন করায় উদ্যোগী হয়েছেন, যা দিয়ে দেশীয় চাহিদা মেটে। তিনি বিকাশমান মধ্যবিত্তের চাহিদা পূরণে মনোযোগী হয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে মান বজায় রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। স্কয়ার গ্রুপের একের পর এক প্রতিষ্ঠান আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দিয়ে চলেছে। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে নির্মাণ করার পর নতুন আরেকটিতে বিনিয়োগ করেছেন। ওষুধ শিল্প গড়ে তোলার পর গড়েছেন আধুনিক মানের হাসপাতাল। প্রসাধনীর পর নিত্যদিনের পণ্য চাহিদা পূরণে মনোযোগী হয়েছেন। সেখান থেকে এসেছেন মিডিয়ায়। আগ্রহ দেখিয়েছেন বিশ্ববাজারে নিজের স্থান করে নিতে। বিশ্ববাজারে স্কয়ারের ওষুধ জনপ্রিয়। যে পণ্য যথেষ্ট মূল্য সংযোজন করতে পারবে, তা রফতানি করতে চেয়েছেন। এ জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন হয়, দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে হয়। তিনি তা করেছেন। স্যামসন এইচ চৌধুরী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একজন ছিলেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় আমলেই তাদের বঞ্চনা অনেক। কিন্তু তিনি সব বাধা অতিক্রম করেই হয়ে ওঠেন রোল মডেল। সব সম্প্রদায়ের মানুষের স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন। তাকে কেউ সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র গি তে বিবেচনা করেন না, বরং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সারিতে রাখেনথ এ তো অনন্য অর্জন। তিনি গভীরভাবে ধর্মীয় অনুভূতি পোষণ করতেন। খ্রিস্টীয় দানশীলতায় প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল তার। এ জন্য চ্যারিটি তহবিল গঠনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে এর সুবিধা ধর্মনির্বিশেষ সবার জন্য যেন নিশ্চিত হয়, সেটা তিনি চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে মানবতাবোধ ছিল প্রধান প্রেরণা। তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে কখনও সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ ছিল প্রখর। ২০০৬ সালে সিপিডি নাগরিক কমিটি গঠন করলে তিনি তার সদস্য হন। এ সময়ে আর্থ-সামাজিক স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি অনেক ইস্যুতে তার সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ ঘটে। সে সময়ে পরিবেশ মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু তার প্রখর রাজনৈতিক চেতনা, সাহস ও ধৈর্য আমাদের সবার মধ্যে সৃষ্টি করত উৎসাহ। স্যামসন চৌধুরী সুদর্শন ছিলেন। সর্বদা স্টাইলিস্ট দীর্ঘদেহী মানুষটির ছিল নান্দনিক মন। এক কথায় বলতে পারি, প্রাচীন মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একজন আধুনিক সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন আমাদের নিকটজন হয়ে। তবে আমাদের সবার জন্য কিছু পরিতাপের বিষয় থাকছেই। আমাদের দেশে ক্ষণজন্মা দুর্লভ গুণের মানুষ আসেন। জ্ঞান, মূল্যবোধ, উচ্চ নৈতিক আদর্শের কারণে তারা বরণীয় হন। কিন্তু দেশ পরিচালনায়, সমাজকে পথনির্দেশ দানে তাদের পরামর্শ কি সর্বদা আমরা কাজে লাগাতে উদ্যোগী হই? এ ধরনের প্রাজ্ঞজনদের কাছ থেকে আরও কিছু পাওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। তার চেষ্টাও লক্ষণীয় নয়। তিনি দেশের জন্য, দশের জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ উদ্যোগী হলে তার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু গ্রহণ করতে পারত। প্রথাগত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তিনি পাননি। কিন্তু সেটা নিশ্চিত করা তো আমাদেরই দায় ছিল এবং এখনও কিন্তু রয়ে গেছে। তার সঙ্গে আমার শেষ কথা দিয়েই এ লেখার ইতি টানব। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাজে আমি যুক্ত ছিলাম। মেধাস্বত্ব আইনের বিশেষ সুবিধা শেষ হচ্ছে ২০১৬ সালে। এটা বাড়ানো যায় কীভাবে সেটা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এমনকি জেনেভাতেও এ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সুবিধা পেলে বাংলাদেশের লাভ; এ দেশে নতুন নতুন যেসব কোম্পানি আসবে, তাদের লাভ। তার নিজের প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে নিজের জন্য বিশেষ কোনো অর্জন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তিনি যে সবার কথা ভাবার মানুষ!
 
স্বচ্ছতা নৈতিকতা বজায় রেখেই শিখরে যিনি
মাহবুবুর রহমান

এ ধরনের প্রাজ্ঞজনদের কাছ থেকে আরও কিছু পাওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। তার চেষ্টাও লক্ষণীয় নয়। তিনি দেশের জন্য, দশের জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ উদ্যোগী হলে তার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু গ্রহণ করতে পারত এমন বড়মাপের মানুষ ছিলেন, এত বড় ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অধিপতি; কিন্তু আচরণে, কথায়, ব্যবহারে কিছু বোঝার উপায় ছিল না। অহমিকা নেই, আত্মপ্রচারে বিমুখ, বিনয়ীথ স্যামসন চৌধুরী সম্পর্কে এ সবই বলা যায়। এখন যারা বিভিন্ন চেম্বারের দায়িত্বে রয়েছেন, যারা শিল্প-বাণিজ্যের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত, তাদের বেশিরভাগের সঙ্গে তার বয়সের অনেক পার্থক্য। কিন্তু সবার সঙ্গে মিশতেন এমনভাবে, যেন বহু পুরনো সহকর্মী কিংবা সমবয়সী। আমি আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের সভাপতি। এ সংগঠনে তিনি ছিলেন বোর্ড সদস্য। আমাদের কাজকর্মে তার সহযোগিতা-উপদেশ সর্বদা নিয়েছি। প্রতিটি সভা-সেমিনারে উপস্থিত থাকতেন। পরামর্শ মিলত প্রতিটি কাজে। সহ-সভাপতির একটি পদ শূন্য হলে কাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাদের আপত্তি না হলে আমাকে নিতে পারেন। আমি তো বিস্ময়ে হতবাক। তাকে বলি, আমি যে সংগঠনের সভাপতি, সেখানে আপনি কী করে সহ-সভাপতি হবেন! সেই চিরপরিচিত হাসিমুখে তিনি বলেন, আপনি সংগঠন ভালো চালাচ্ছেন, সময় দিচ্ছেন। আমি তা পারব না। তিনি সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। যাদের সঙ্গে কথা বলতেন তাদের হৃদয়-মন ছুঁয়ে যেতেন। মাটির মানুষ বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন ঠিক তাই। আমাদের দেশে স্যামসন এইচ চৌধুুরীর মতো আরও অনেক উদ্যোক্তার নাম করা যায়। কারও কারও অর্র্থ-সম্পদ হয়তো তার চেয়েও বেশি। কিন্তু তিনি যে উচ্চ নৈতিক মান বজায় রেখেছেন দশকের পর দশক, তা ব্যতিক্রম। তিনি তিলে তিলে যেমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তেমনি সযতেœ তৈরি করেছেন নিজের ভাবমূর্তি। আমি অনেককে দেখেছি, সামান্য অবস্থা থেকে যারা বড় হয়েছেন তাদের অতিমাত্রায় হিসেবি স্বভাব থাকে। কিন্তু তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তাই বলে ১০ টাকা দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে ১০০ টাকা দিতেন না। কিন্তু যদি ১ লাখ টাকা দেওয়ার দরকার হতো, তাতেও কার্পণ্য ছিল না। তিনি মেথোডিক্যাল ছিলেন; একই সঙ্গে ছিলেন উদার হৃদয়ের। তার সঙ্গে অনেকবার সপরিবারে বিদেশ গিয়েছি। লতিফুর রহমান একাধিকবার ছিলেন আমাদের সঙ্গে। এ ধরনের সফরে গল্পে-আড্ডায় মানুষ চেনা যায়। স্যামসন চৌধুরীর ছবি তোলার খুব শখ ছিল। নিজেও ভালো ছুবি তুলতেন। কুয়ালালামপুরে ওয়ার্ল্ড চেম্বার কংগ্রেসে তিনি ও বৌদি এবং আমি ও আমার স্ত্রীর ছবি তোলা হয়েছিল তারই আগ্রহে। এই বড়দিনে এ ছবি দিয়ে কেক পাঠিয়েছিলাম তার কাছে। চীনে আইসিসি কংগ্রেস থেকে হংকং হয়ে ফেরার সময় শপিং মলে বেড়াতে গেলে আমাদের কয়েকজনকে দামি ব্র্যান্ড জুতা কিনে দিয়েছিলেন। তিনি রুচিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন এবং সর্বদা তা বজায় রাখতেন। তিনি শুধু শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়েননি, সমাজকেও নাড়া দিতে পেরেছিলেন। তার সমকক্ষ কাউকে এখন দেখি না। অনেকের হয়তো তার চেয়ে বেশি অর্থ আছে। কিন্তু নেতৃত্ব, দূরদৃষ্টি, আন্তরিকতা, নৈতিক মানে তিনি অনন্য। প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাদের সময়ের লিজেন্ড। তার কাছে শুনেছি এগিয়ে যাওয়ার গল্প। কীভাবে বাধা জয় করেছেন, বলতেন। এ জন্য কখনও হীনম্মন্যতায় ভুগতেন না। কীভাবে নিজের কারখানার সিরাপ বিক্রি করেছেন সে গল্প শুনেছি তার কাছেই। শিল্প স্থাপনের উদ্যোগে অনেক সময় কষ্ট পেয়েছেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সহায়তা মেলেনি। সরকার ও প্রশাসনের কেউ কথা দিয়ে কথা না রাখলে কষ্ট পেতেন। রাজনীতি নিয়ে কখনও আলোচনা করতেন না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে চাইতেন স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নতুন কী নীতি দরকার, কোথায় সংস্কার করতে হবে, বলতেন নির্ভয়ে। সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা ছিলথ সহায়ক নীতি ও কৌশল ঠিক করে দাও, যেন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসতে পারে। সরকার অযথা ব্যবসায়িক কাজে হস্তক্ষেপ করলে কী সমস্যা তৈরি হয় সেটা জানতেন। তিনি সংগ্রাম করে সামনে এগিয়েছেন। সর্বদা চাইতেন, নতুন যারা এগিয়ে আসবে তাদের যেন বাধা কম মোকাবেলা করতে হয়। এতেই দেশের উন্নতি ঘটতে পারে। তার একটি বড় সাফল্য, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিজের মহৎ গুণাবলি ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। তাদের কাছে নিজের জীবনের কঠিন সময়ের কথা বলতেন। আমরা যেমন বন্ধুবৎসল একজন বড় ভাই পেয়েছি, যে কোনো প্রয়োজনে তার কাছে ছুটে যেতে পেরেছি, তেমনি তার সন্তানেরা সর্বদা পেয়েছে একজন আদর্শ পিতাকে। তাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। কাজ শিখিয়েছেন। মানুষকে সম্মান দিতে বলেছেন। মৃত্যুর আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে স্ত্রী কাছে গেলে সন্তানরা বলেনথ বাবা, মা এসেছেন তোমার কাছে। তিনি বলেছিলেন, তোমাদের মা সারাক্ষণ আমার সঙ্গে আছেন। পারিবারিক বন্ধনে তার ছিল গভীর আস্থা। এক ভবনে ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে থাকতেন। সকালে উঠতেন। অনেক সময় সন্তানেরা অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে শুনতেন, চেয়ারম্যান আগেই অফিসে চলে গেছেন। তাকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ দায়িত্ব প্রদান ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি ২০টির মতো শিল্প প্রতিষ্ঠান চালাতেন। এর কোনো একটিতে কর ফাঁকির ঘটনা ঘটলে, কেউ ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে কিংবা ব্যবসায়িক অসততা ধরা পড়লে টিআইবি নিজেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত। কিন্তু আমাদের সবার জন্য সৌভাগ্যের কথা যে, তিনি কখনও স্বচ্ছতার গি র বাইরে যাননি। তিনি বছরের পর বছর সর্বোচ্চ করদাতাদের তালিকায় ছিলেন। কারখানা করার জন্য তাকে কখনও ভূমিদস্যুতা করতে হয়নি। তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পণ্যের মান নিয়ে কেউ কখনও প্রশ্ন তোলার অবকাশ পায়নি। আমাদের চারপাশে অনেক প্রলোভনের ফাঁদ রয়েছে। কলুষিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা মোটেই সহজ নয়। কিন্তু তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। এ কাজ সহজ ছিল না। কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছেনথ স্বচ্ছতা, নৈতিকতা বজায় রেখেই উন্নতির শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। তার বিকল্প আপাতত দেখি না।
মাহবুবুর রহমান :আইসিসি, বাংলাদেশ সভাপতি। সৈজন্যে সমকাল-৮-১-২০১২

বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত পর্যটন শিল্প
॥ মোঃ নুরুল আমিন ॥
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং নিরাপদ বিনিয়োগ খাত দেশের পর্যটন শিল্প। এই পর্যটন শিল্পেই রয়েছে দেশী ও বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েই আমাদের দেশ পৌছে যেতে পারে উন্নতির চরম শিখরে। তাই এই সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি ভাবেও ব্যপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ করছে এবং বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করছে। যার ফলে দিন দিন এই শিল্পের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে। এছাড়াও পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে বিনিয়োগকারীরাও কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় সার্ভিস্ড এ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগকে সবচেয়ে লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগ বলে মনে করছে। ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে কক্সবাজার ও কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের সড়ক পথকে ছয় লেনের হাইওয়ে রোড, রেল যোগাযোগ, বিমান বন্দর ও ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ রোড ছাড়াও কক্সবাজার থেকে টেকনাফ হয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত পর্যটনের উন্নয়নের লক্ষ্যে এক মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় হোটেল মোটেল জোন, খেলার মাঠ, সরকারী অফিস-আদালত, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, এ্যামিউজমেন্ট পার্ক, এডুকেশন জোন, ন্যাচারাল পার্ক, ইকোট্যুরিজম, শিল্প এলাকা, ট্যুরিস্ট জোন, সেন্টমার্টিনে ইকোট্যুরিজম এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন বিনোদন ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ করা হয়েছে। এছাড়াও কুয়াকাটাকে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতু ছাড়াও ২০১৩ সালের মধ্যে ঢাকা-কুয়াকটা মহাসড়কে ফেরী বিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু, ঢাকা-কুয়াকাটা রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন এবং কুয়াকাটাতে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও পদ্মার ওপাড়ে শরিয়তপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর স্থাপিত হলে পর্যটন শিল্পে কুয়াকাটার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বহুগুণে। বেসরকারি উদ্যোগেও পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও কুয়াকাটার উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের সকল সুযোগ-সুবিধাসহ থ্রী স্টার ও ফাইভ স্টার মানের সার্ভিস্ড এ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ ছাড়াও ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। বেসরকারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে গ্রীন ডেল্টা হাউজিং পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করছে। ইতোমধ্যেই তারা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের থ্রী স্টার ও ফাইভ স্টার সার্ভিস্ড এ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো : কক্সবাজারের কলাতলীতে সমুদ্র বিলাস - ফাইভ স্টার, হিমছড়িতে ঝর্ণা বিলাস - থ্রী স্টার, ইনানীতে সিঙ্গাপুরের মেরিনা বের আদলে ইনানী বে মেরিনা- ফাইভ স্টার এবং কুয়াকাটাতে স্বপ্ন বিলাস- থ্রী স্টার ও গ্রীন ডেল্টা ট্যুরিজম সিটি নির্মাণ করছে। এছাড়াও কক্সবাজারে তাদের আরও বেশ কয়েকটি প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গ্রীন ডেল্টা হাউজিং ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি আবাসন প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার ও কুয়াকাটার উন্নয়নে  কাজ করছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গ্রীন ডেল্টা হাউজিংয়ের চেয়ারম্যান জনাব মোঃ নূরুল আমিন বলেন- বর্তমানে আমাদের দেশের বিনিয়োগের যে অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সব ধরনের বিনিয়োগকারীগণ হাপিয়ে উঠেছেন। গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিতিশীলতা, শিল্প-কলকারখানা গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, শেয়ার বাজারে স্বর্বস্ব হারিয়ে মাথায় হাত ইত্যাদি কারনে মানুষ এখন পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগকেই নিরাপদ, হালাল ও লাভজনক বিনিয়োগ বলে মনে করছে। তাই এই সেক্টরে বিনিয়োগের পরিমান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশ আজ উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করেছে। যেমন : দুবাই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, চীন, ভারত, মালদ্বীপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশিরভাগ দেশেরই জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সিংহভাগ আসে তাদের পর্যটন শিল্প থেকে। উল্লেখ্য যে মালদ্বীপের মতো অত্যন্ত ছোট একটি দেশের জাতীয় আয়ের ৯০ শতাংশ আসে তাদের পর্যটন খাত থেকে। অথচ আমি মনে করি আমাদের বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে যতগুলো পর্যটন এলাকা রয়েছে এবং যে বিশাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার রয়েছে তা পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। আমাদের রয়েছে ৭২০ কি. মি. সমুদ্র পার এই সমুদ্র পারে যদি আমরা দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ রোড নির্মান করে  এবং আমাদের বিশাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে তুলে বিশ্বের কোটি কোটি পর্যটকদের নিকট পৌছে দিতে পারি তাহলে আমাদের দেশই হবে পর্যটনে বিশ্বের সেরা দেশ। আমাদের দেশ হবে বিশ্বের অগনিত পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত। ভারত ও চীন সহ সারাবিশ্বে^র কোটি কোটি পর্যটনপ্রেমী ছুটে আসবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশে এবং মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার তারা খরচ করবে বাংলাদেশের সৌন্দর্য অবলোকনে। তখন করব আমরা মেহমানদারি, অর্জিত হবে বৈদেশিক মুদ্রা, খুলে যাবে দেশ ও জাতির উন্নয়নের দুয়ার। আমাদের দেশের মানুষদের আর বিদেশ গিয়ে ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা লাগবে না। তখন এই মাতৃভূমিতেই হবে তাদের কর্মসংস্থান পাবে উন্নত জাতি হিসেবে মাথা উচু করে বাচার স্বীকৃতি। 

তিনি আরও বলেন, গ্রীন ডেল্টা হাউজিং এক মহা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করে চলেছে। দেশে এ ধরণের মহা পরিকল্পনা এই প্রথম। ইতোমধ্যেই আমরা কক্সবাজার, হিমছড়ি, ইনানী, টেকনাফ, শাহ্পরীর দ্বীপ ও কুয়াকাটায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনের সুবিধা সম্বলিত আধুনিক স্থাপত্য ডিজাইনের বেশ কয়েকটি থ্রী স্টার ও ফাইভ স্টার মানের স্টুডিও টাইপ সার্ভিসড এ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প ও আবাসন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি। দেশের পর্যটন শিল্পকে বিশ্বমানে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমরা সেন্টমার্টিন, রাঙামাটি, বান্দরবান, সিলেটের জাফলং, নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপ, খুলনা ও সুন্দরবনসহ পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পর্যটন এলাকায়ও আন্তর্জাতিক মানের থ্রী স্টার ও ফাইভ স্টার সার্ভিসড এ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প ও শপিং সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ভবিষ্যতে পর্যটকদের ভ্রমনের জন্য আমাদের ব্যবস্থাপনায় থাকবে  বিমান, হেলিকপ্টার, স্টীমার, স্পিডবোট, বিলাসবহুল বাস, মাইক্রোবাস ও জীপের  বিশেষ সার্ভিস। তাই আমি বলতে চাই পর্যটন নগরীর উন্নয়নে প্রাইভেট সেক্টরের এই উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সরকার যদি একযোগে কাজ করে এবং বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে দেয় তাহলে এই পর্যটন শিল্পের মাধ্যমেই আমরা বিশ্বে উন্নত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবো, থাকবে না বেকার সমস্যা মুছে যাবে দারিদ্রতার অভিশাপ।
লেখক: চেয়ারম্যান, গ্রীন ডেল্টা হাউজিং লি.
যে কারণে পরাজিত হচ্ছে আ’লীগ প্রার্থী
নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্বাচন মানেই বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় কোন্দল এবং পরিণতিতে বিপুল ব্যবধানে পরাজয় এই বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর প্রায় সব নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ পরাজয়ের স্বাদ পাচ্ছে হাড়ে হাড়ে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বিদ্রোহের জন্যই মূলত এই হার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকার পরিচালনায় নানা ব্যর্থতার কারণে দলের জনপ্রিয়তা হ্রাস। অথচ এই ধারাবাহিক পরাজয় ঠেকাতে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা বা কৌশল কোনো নির্বাচনেই দেখা যায়নি। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, জেলা থেকে উপজেলাথসব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এই দ্বন্দ্ব ও গৃহবিবাদ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে গত তিন বছরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনের ফলাফল এরকম : পৌরসভা নির্বাচন হয়েছে মোট ২৩৭টির। এর মধ্যে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জিতেছেন ৯০, আর বিএনপি প্রার্থী জিতেছেন ৯৫ জন। সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে তিনটিতে। এর সব কটিতেই হেরেছে আওয়ামী লীগ। এমপির মৃত্যুর কারণে উপনির্বাচন হয়েছে তিনটি সংসদীয় আসনে। এতেও আওয়ামী লীগ হেরেছে একটিতে। আর চার হাজার ২৯৮টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দুই হাজার ১৯৭টিতেই হেরেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। অথচ তিন বছর আগের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট জিতেছিল ৩০০টি আসনের ২৬২টিতেই। এর মাত্র ২৪ দিন পরই অনুষ্ঠিত ৪৭৫টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ একক আধিপত্য বজায় রেখে ৩০৪টিতে জয়ী হয়। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে, আওয়ামী লীগের ললাটে লেপন হতে থাকে পরাজয়ের কালিমা। অথচ এই পরাজয়ের গ্লানির বিপক্ষে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব তা প্রমাণ হয়েছে, জনগণের রায়কে দল মেনে নিয়েছে, এটা স্থানীয় নির্বাচন এবং এটাতে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ে নাথএ ধরনের গৎবাঁধা ও দায়সারা জবাব দিয়েই চুপ থাকছেন দলের শীর্ষ নেতারা। আবার দলের দুর্বলতার কারণে নির্বাচনে পরাজয়ের কথা স্বীকার করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও তুলছেন কেউ কেউ। তবে প্রবীণ নেতারা মনে করছেন, দলের সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা নেতারা সংগঠনে ঐক্য প্রতিষ্ঠা আর সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিম লীর সাবেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা এবং দলের সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় সম্পর্কে গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, দল বড় হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তবে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দলের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারছেন না। দলের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এবং যেকোনো নির্বাচনের আগে সবাইকে বসে একক প্রার্থী নির্বাচন করার তাগিদ দেন তিনি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে দলের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে বলেন, নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে দল কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় না বলেই তাঁদেরকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন নির্বাচনে পরাজয় দলের জন্য ক্ষতিকর মন্তব্য করে হানিফ আরো বলেন, আগে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও পরে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তবে আগামী কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ ব্যাপারে আলোচনা করা হবে এবং একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। দলীয় প্রার্থীকে দলের সব নেতার সমর্থন না দেওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ বলেন, দলে কিছুটা সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে। তবে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় দলে অনেক সময় সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করা সম্ভব হয় না। দায়বদ্ধতার কারণে অনেক সময় জনপ্রিয়তার চেয়ে সংগঠনের প্রতি আনুগত্য বেশি বিবেচনা করা হয়। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পায় আওয়ামী লীগ। ১৭ জুন ২০১০ অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী পরাজিত হন বিএনপি প্রার্থী এম মঞ্জুর আলম মঞ্জুর কাছে। ৯৫ হাজার ৫২৮ ভোটের বিশাল ব্যবধানে মঞ্জুর হারিয়ে দেন তাঁরই রাজনৈতিক গুরু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। চট্টগ্রাম নির্বাচনে দল মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সমর্থন দিলেও তাঁর পক্ষে মাঠে নামেননি স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আবারও প্রকাশ পায় গত বছর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনগুলোতে। বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগ দুই বছরের মাথায় নির্বাচনের রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পিছিয়ে পড়ে সাধারণ নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়া বিএনপির কাছে। পৌরসভা নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ২১ জন বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হন। তখনই বিশ্লেষণে বের হয়, ভুল প্রার্থী মনোনয়ন, দলীয় কোন্দল এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের অদক্ষতার কারণে পৌরসভায় কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি ক্ষমতাসীনরা। প্রথম দফায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের পৌরসভা নির্বাচনে ফলাফল বিপর্যয়ে ক্ষুব্ধ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিষ্ক্রিয় করার নির্দেশ দেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবেথএমন নির্দেশও দেওয়া হয় দলের পক্ষ থেকে। তারপরও নির্বাচন থেকে সরানো যায়নি বহু বিদ্রোহী প্রার্থীকে। পৌরসভার রেশ না কাটতেই শাসক দল আবারও ধাক্কা খায় হবিগঞ্জ-১ উপনির্বাচনে। দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুর কারণে শূন্য হওয়া এই সংসদীয় আসনটিতে জয় ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগ। তবে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের উপনির্বাচনে জয় ধরে রাখে আওয়ামী লীগ। এরপর স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির আমেজ ছড়ানো নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও শক্ত ধাক্কা খায় ক্ষমতাসীন দল। গত ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থী লক্ষাধিক ভোটে পরাজিত হন বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে। আওয়ামী লীগের দুই নেতা শামীম ওসমান ও ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দুজনই ছিলেন সমর্থন-প্রত্যাশী। দফায় দফায় বৈঠক, দুই প্রার্থীকে দলীয় পদ দেওয়া, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য বানানোর মতো নানা টোপ ও ফর্মুলায় গিয়েও শেষ পর্যন্ত দুজনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি দলটি। ফলে নির্বাচনের মাঠে থাকে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীই। অবশেষে আইভী পান এক লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমান পান ৭৮ হাজার ৭০৫ ভোট। সব শেষ গত বৃহস্পতিবার নবগঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও দলীয় কোন্দল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর বলি হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। দলের সভাপতিম লীর সদস্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কুমিল্লার সব সংসদ সদস্যকে নিয়ে বৈঠক করে আফজল খানকে সমর্থন জানান। কিন্তু পরে দলের দুই বিদ্রোহী প্রার্থী অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মিঠু ও নূর উর রহমান মাহমুদ তানিমকে নির্বাচনের মাঠ থেকে নিষ্ক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে নির্বাচনে বিএনপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া সম্মিলিত নাগরিক কমিটির নেতা মনিরুল হক সাক্কু সহজ জয় পান। তিনি পান ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত অধ্যক্ষ আফজল খান পান ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট। এ ছাড়া গত বছর ৩১ মে থেকে শুরু হয়ে ৫ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে বিএনপি। ইউপি নির্বাচনে প্রায় প্রত্যেক জায়গায় ছিল আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী। মোট ৪২৯৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ২১০১, বিএনপি সমর্থিত ১৬১৮, জাতীয় পার্টি সমর্থিত ৮৪, জামায়াত সমর্থিত ১২৯, স্বতন্ত্র ২৪৭ এবং অন্যান্য দল ও সংগঠনের সমর্থিত প্রার্থী জয়লাভ করে। এ নির্বাচনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও তাদের ভোট ব্যাংকে হানা দেয় বিরোধী দল বিএনপি। এ ছাড়া ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও ধরপাকড় অব্যাহত থাকলেও জামায়াত তৃতীয় অবস্থান দখল করে। আসছে ১৯ জানুয়ারি নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচন। সেখানেও রয়েছে আওয়ামী লীগের তিন তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ১ নভেম্বর সন্ত্রসীদের গুলিতে নরসিংদী পৌরসভার জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেন নিহত হন। পরে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত জেলা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করলে তিনি নিহত লোকমানের ছোট ভাই কামরুজ্জামান কামরুলকে দলের সমর্থন দেন। কিন্তু দলীয় প্রধানের সমর্থন পেলেও কামরুল পাননি জেলা আওয়ামী লীগের সমর্থন। জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা প্রচারে নেমেছেন দলের প্রধান বিদ্রোহী প্রার্থী নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোন্তাজ উদ্দিন ভুঁইয়ার পক্ষে। এ ছাড়া রয়েছে দলের অপর দুই বিদ্রোহী প্রার্থী আমজাদ হোসেন ভুঁইয়া এবং হাজি আফজাল। দলের মধ্যে নতুন আশঙ্কা দেখা দিচ্ছেথএই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে না পারলে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের ধারাবাহিকতাই অপেক্ষা করছে নরসিংদীতে।
সাক্কুর সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অষ্টম ও সবচেয়ে নবীন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের বয়স আজ ১৮৯ দিন। ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন কুমিল্লা পৌরসভা ও কৃষি অর্থনীতির মূল ভিত্তি নিখাদ গ্রাম নিয়ে গঠিত কুমিল্লা সদর দক্ষিণ পৌরসভার সমন্বয়ে কুসিকের জš§ ২০১১ সালের ৬ জুলাই। ৫ জানুয়ারি এ সিটির নির্বাচনে কুমিল্লাবাসী তাদের অভিভাবক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান মনিরুল হক সাক্কুকে। ক্ষমতাসীন সরকারে প্রতিনিধিত্বশীল এতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ  থেকে মনোনয়ন পেয়েও এ নির্বাচনে জিততে পারেননি অপর (হেভিওয়েট!) প্রার্থী অ্যাডভোকেট অধ্যক্ষ আফজল খান। তিনি কি শুধুই পরাজিত হয়েছেন? মনিরুল হক সাক্কু আফজল খানের চেয়ে ৫৬ শতাংশ  ভোট বেশি পেয়েছেন। এতে তিনি  হেরেছেন বটে, কিন্তু ফলাফল ঘোষণার আগেই তার পরিবারের পক্ষ থেকে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে  নেওয়া হয়। আফজল খান নিজেও নবনির্বাচিত মেয়রকে অভিনন্দন জানান এবং সকল সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বিভক্ত কুমিল্লাবাসীকে সব ধরনের বিভক্তি থেকে দূরে রাখেন। এ সবের মাধ্যমে তার এক ধরনের জয়ও হয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচনের কাজে অংশ নেওয়া নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। তবে এ ক্ষেত্রে জয়ী সাক্কুও বিশাল বিজয়ের পর উচ্ছ্বাসে ভেসে যাননি। তিনি জানেন, এ বিজয় কেবল তার একার নয়। এ বিজয়ের   পেছনে আছেন এক ঝাঁক নেপথ্য কারিগর। যাদের সুদক্ষ রাজনৈতিক কূটনীতি, সম্ভাবনাময় কর্পোরেট পুঁজির হাতছানি ও তার মন্দের ভালো ইমেজ অনেক বেশি কাজ করেছে। সাক্কু এটাও জানেন, জনগণের এ বিশাল চাপ ও চাহিদা সামলানোর সক্ষমতা বা সুযোগ তার কমই আছে। তাই জনগণের আস্থা ধরে রাখা তার জন্য হবে বিশাল চ্যালেঞ্জ। এটা রাষ্ট্র বা রাজ্য পরিচালনার মতো কঠিন না হলেও নারায়ণগঞ্জের নতুন  মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর মতো এতোটা সহজও নয়। মনিরুল হক সাক্কুর জন্য সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ সবার আগে উঠে আসবে, তা হলো-কৃষি নির্ভর ৬৩টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ পৌরসভার সঙ্গে ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা পৌরসভার সমন্বয় সাধন করে সুষম উন্নয়নের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে দু’দিকেই তার জন্য চ্যালেঞ্জ সমান-সমান। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কুমিল্লায় বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীদের আগ্রাসন সবচেয়ে  বেশি। আর এদের ৯৯ ভাগই সরকার অঅনুমোদিত। এরা এক সঙ্গে যেমন শহরের আড়াইশ’ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যগুলো ধ্বংশ করে হাইরাইজ ভবন তৈরি করছে ঠিক তেমনি সদর দক্ষিণ পৌরসভার গ্রাম্য ফসলের ক্ষেত, মাছের খামার, বাশ বাগান, সবজী ক্ষেত্র, পুকুর, নালা, খাল দখল করে হাউজিং ব্যবসার  শেকড় গাড়ছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে কুমিল্লার ঐতিহ্য ও ফসলের ক্ষেত। এসব ভূঁইফোড়  কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রেই জমির আইল ভাড়া নিয়ে সাইন বোর্ড টাঙ্গিয়ে ব্যবসা করছে। এদের ব্যবসার পুঁজিও সংগ্রহ হচ্ছে অদ্ভূত পদ্ধতিতে। অনেকটা হায়হায়  কোম্পানির মতো এরা অধিক মুনাফার কথা বলে সামাজিক ব্যবসার আদলে আমানতকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করছে। এর একটি উদাহরণ দিলেই পাঠকের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ডেইলি সানের কুমিল্লা প্রতিনিধি মাসুদুর রহমান ও তার স্ত্রী এমন একটি হাউজিং কোম্পানিতে লগ্নি করেছেন ৬ লাখ টাকা। এ জমানত থেকে তিনি প্রতি মাসে মুনাফা পান লাখ প্রতি দুই হাজার টাকা। অনেক কোম্পানি আবার এর চেয়ে অনেক বেশিও মুনাফা দিয়ে থাকে।
নগরপিতা হিসেবে মনিরুল হক সাক্কু কি এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ে ভাববেন? না ভেবে তার উপায় নেই। কেনে না এসব কোম্পানি যেমন নতুন এ সিটি কর্পোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করছে তেমনি ধ্বংস করছে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও ঐতিহ্য। হুমকির কিনারে নিয়ে যাচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও। সাক্কুর জন্য আর একটি চ্যালেঞ্জ হলো শহর ও গ্রামের সমন্বয় সাধন। কুসিকের ১৮ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত ৯টি ওয়ার্ডে মোট ৬৩টি গ্রাম নতুন এ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো সত্যি সত্যিই নিপাট গ্রাম। সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্তির ফলে মুরাদপুর, নুরপুর, নেউরা সৈয়দপুর, উত্তর রসুলপুর, দক্ষিণ রসুলপুর, নোয়াপাড়া, রাজাপাড়া, উনাইসার, দিশাবন্দ, লক্ষ্মীনগর, কাজীপাড়া, আশ্রাফপুর, জাংগালিয়া, রামনগর, শাকতলা, শ্রীবলভপুর, শ্রীমন্তপুর, উত্তর রামপুর, উত্তর হিরাপুর, দক্ষিণ গোপীনাথপুর, মোস্তফাপুর, কচুয়া, দৈয়ারা, লক্ষ্মীপুর, দূর্গাপুর, চাংগিনী, চাঁদপুর, মনিপুর, বাতাবাড়িয়া, নন্দনপুর, জয়পুর, মঠপুস্করিনী, উত্তর বাগমারা, দক্ষিণ বাগমারা, ফিরোজপুর, লালমাই, রামপুর, সালমানপুর, কালিকিংকরপুর, চৌয়ারা, ছোট ধর্মপুর, ডুমুরিয়া, তারাপাইয়া, দয়াপুর, কালিকাপুর, গোয়াল মথন, চাংগিনী, ধনপুর, মহেশপুর, ধনেশ্বর, বলভপুর, বাউবন্দ, রাজেন্দ্রপুর, মাটিয়ারা পূর্ব, মাটিয়ারা পশ্চিম, রায়পুর, সাওড়াতলী, উলুরচর, পাঠারকোট, নোয়াগ্রাম, উত্তর ধানাইতরী, ধানাইতরী, কমলাপুর গ্রামের হাজার হাজার মানুষের ফসলী ক্ষেত, মাছের পুকুর, বাঁশ বাগান, ফলের বাগান, সব্জিক্ষেত খেলার মাঠ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। ঠিক তেমনি বেড়ে যাবে অধিক কর ও জীবনযাত্রার খরচ। মেয়রকে তা শক্ত হাতেই সামলাতে হবে। নজর দিতে হবে কৃষক ভোটারের যেনো চোখের দু:স্বপ্নে বিলিন না হয়। কুমিল্লা শহরের মানুষের চোখে সবচেয়ে বড় সমস্যা মাদক, যানজট ও জলজট। সীমান্তবর্তী শহর হওয়ায় এখানে সব ধরনের মাদক যেমন সস্তা, তেমন সুলভ। অনেক স্থানীয়েরই ধারণা, কুমিল্লার মোট তরুণ প্রজšে§র অর্ধেকেরই বেশি মাদকাসক্ত। অনেকে মজা করে বলেন, এখানকার মেয়ের বাবারা বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে হস্তান্তরের জন্য উপযুক্ত পাত্র পান না এ মাদকের জন্য। কেননা কেউ তো আর জেনে বুঝে কোন মাদকাসক্তের হাতে তার মেয়ে তুলে দেবেন না। এ ধরনের অপবাদ দূর করার জন্য মেয়রকে আজ থেকেই মনোযোগী হতে হবে। কুমিল্লা শহরে সাড়ে তিনশ’ ইজি বাইকের চলাচলের বৈধ অনুমোদন আছে সাবেক পৌরসভার। কিন্তু শহরে এখন চলছে সাড়ে সাত হাজার ইজি বাইক। তাই অনেকেই এ শহরকে বলে থাকেন ইজি বাইকে বিজি শহর। এ শহরে অবৈধ রিকশার সংখ্যাও বৈধের কমপক্ষে ৭ গুণ। তাই এ শহরে যে কেউ এলেই তার মনে হবে- তিনি বুঝি পুরোনো ঢাকার কোন সড়ক পার হচ্ছেন। সিটি মেয়র হিসেবে এই দুঃসহ যানজট দূর করা সাক্কুর জন্য আর একটি চ্যালেঞ্জ। কুমিল্লা শহরবাসী শহরের জলাবদ্ধতার জন্য সাবেক পৌর মেয়র ও নব নির্বাচিত সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকেই দায়ী করেন। তাদের ধারণা, শহরের মূল ড্রেনগুলো সংকুচিত করে বাগান তৈরির জন্যই এখন সামান্য বৃষ্টিতে শহর হাঁটু পানিতে ডুবে থাকে। এ দুর্ভোগ লাঘবে তাই নগর পিতাকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। মনিরুল হক সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হয়েই  এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘তিনি প্রতিশ্রুতি দিতে পছন্দ করেন না এবং তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার পরামর্শে কাজ করবেন। এমন মন্তব্য অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তবে তিনি কেবল বিএনপির ভোটে বিজয়ী মেয়র নন। তার ভোটারদের একটি বড় অংশই হলো মন্দের ভালোর সমর্থক। তাই সেসব ভোটারের চাহিদার দিকে নজর না দিলে জনগণও সময় মতো তার প্রতিফল দেবে। তবে এ নির্বাচনেরর মাধ্যমে যেমন কুমিল্লাবাসী শতভাগ প্রযুক্তির নির্বাচনে অংশ নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন, তেমনি তারা তাদের ভোটে নির্বাচিত মেয়রকেও সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সব সময় বিজয়ী দেখতে চান।

বর্ষসেরা কোচ গার্দিওলা
ক্রীড়া ডেস্ক
যেমন গুরু তেমন শিষ্য। মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তা ও ভিয়াদের নৈপুণ্যে ফুটবল পায় নতুন রূপ। আর এ সকল তারকাদের সমন্বয়ে গঠিত স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় যার অধীনে খেলেন তিনিও কম কিসে। তাই মেসিদের গুরু পেপ গার্দিওলাকে বিশ্বসেরা কোচ হিসেবে নির্বাচিত করেছে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল  ফেডারেশন অব হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (আইএফএফএইচএস)। ২০১ পয়েন্ট নিয়ে ‘বিশ্বসেরা’ কোচ হয়েছেন গার্দিওলা। তার পরে রয়েছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনহো ও ইলিংশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। গার্দিওলার অধীনে বার্সেলোনার কাছে ধরা দিয়েছে স্প্যানিশ লা লিগা, সুপার কোপা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, উয়েফা সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা। আর এক সপ্তাহ আগে আইএফএফএইচএস সেরা প্লেমেকার হিসেবে নির্বাচিত করে তার শিষ্য জাভি হার্নান্দেসকে। এছাড়া বিশ্বসেরা গোলরক্ষক হিসেবে নির্বাচত হন রিয়াল মাদ্রিদের ইকার ক্যাসিয়াস।

তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা ফুটবলার হলেন লিওনেল মেসি
ক্রীড়া ডেস্ক
তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা ফুটবলার হলেন লিওনেল মেসি। ফিফা’র বিশ্বসেরা ফুটবলারের সম্মান ‘ফিফা ব্যালন ডি ওর’ ২০১১ সালের জন্যও নির্বাচিত হলেন তিনি। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা জানায় সতীর্থ জাভি হার্নান্দেজ এবং রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে হারিয়ে ‘ফিফা ব্যালন ডি ওর’-এ হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেছেন তিনি। এর আগে দু’বারের বেশি ফিফা বর্ষসেরা হয়েছেন মাত্র দু’জন। তাদের একজন হচ্ছেন ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান এবং অপরজন হলেন ব্রাজিলের রোনাল্ডো লুইজি নাজারিও ডিলিমা। তবে এদের কেউই পরপর তিনবার পুরস্কারটি জিততে পারেননি। সেদিক থেকে সোমবার তাদের দু’জনকেই ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। ২০১১-তে ৫৫ ম্যাচে ৫৩টি গোল করেন লিও আর সতীর্থদের দিয়ে করান ২৪টি গোল। তার ক্লাব বার্সেলোনাকে জিততে সহায়তা করেন লা লিগা, ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপসহ পাঁচ পাঁচটি শিরোপা। জাতীয় দল আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নির্বাচিত হন এবং দেশের হয়ে ব্যক্তিগত গোল খরা কাটাতে সমর্থ হন গেল বছরেই। ১৯৪ গোল করে তার বার্সেলোনার সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয়স্থানে উঠে আসেন মেসি। জাভি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে হারিয়ে ‘ইউয়েফা বেস্ট প্লেয়ার ইন ইউরোপ’ এর খেতাবটি জেতেন তিনি। মেসির প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ৫৪ ম্যাচে করেন ৫৩ গোল, এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৪০ গোল করে লা লিগায় গড়েন নতুন রেকর্ড। তবে তার খেলার খুব একটা প্রভাব পড়েনি দল রিয়াল মাদ্রিদের খেলায়। কেবল কোপা দেল রে জিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। মেসি যদি বার্সেলোনার প্রাণ হন জাভি হচ্ছেন তার নীরব কম্পন। মেসি-রোনালদোর মতো মাঠে ততটা সরব না থাকলেও খেলার ভিত গড়ে তোলার কাজটা তিনি করে যান ঠিকই। তবুও মাঝে মাঝে মাঠে তার ছিঁটেফোঁটা দেখা যায়। গোল করার পাশাপাশি গেল মৌসুমে তিনি গোল করিয়েছেন মোট ১৪টি। ২০১১’র পারফরম্যান্সের জন্য বিশ্বসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হলে সোমবার মেসি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘পুরস্কারটি অনেক সম্মানের। জয় আনন্দের। আমার ভোটারদের ধন্যবাদ দিচ্ছি। আর্জেন্টিনা সমর্থক ও বার্সার সতীর্থদেরও ধন্যবাদ।’

 সংসার ভাঙছে পূর্ণিমার!
বিনোদন প্রতিবেদক
সংসার ভাঙছে পূর্ণিমার। একান-ওকান হয়ে এ খবর এখন চাউর চলচ্চিত্রপাড়ায়। যদিও এ খবরের সত্যতা জানতে সংবাদ২৪.নেট থেকে বার বার পূর্ণিমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার মুঠোফোনটি অনবরত বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তাই সন্দেহ আরও জোরালো হচ্ছে। শুধু সন্দেহ নয়, এটিকে সত্য বলে মেনে নেয়ারও যথেষ্ট কারণও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণিমা নতুন কোনো কাজ হাতে নিচ্ছেন না। গত সপ্তাহে শীর্ষ একজন চলচ্চিত্র পরিচালক তার ছবিতে পূর্ণিমাকে নিতে চাইলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, তার স্বামী ফাহাদ চাচ্ছেন না পূর্ণিমা আর অভিনয় করুক। কিন্তু কেন? নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ফাহাদকে বিয়ে করার সময় পূর্ণিমার কাছে তার শর্ত ছিল তাকে মিডিয়ায় অভিনয়শিল্পী কিংবা মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে হবে। কিন্তু বিয়ের তিন বছর পরও স্বামী ফাহাদের এ ইচ্ছা পূরণ করে দিতে পারেননি পূর্ণিমা। এখানেই দ্বন্দ্ব এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের সূত্রপাত। সূত্র জানায়, কমপে এক বছর ধরে এ নিয়ে পূর্ণিমা ও ফাহাদের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব অনেক দীর্ঘ হয়েছে। ঝগড়াঝাটি, নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পূর্ণিমা নাকি এ অবস্থার দ্রুত অবসান চাচ্ছেন। ২০০৮ সালে পূর্ণিমা-ফাহাদের বিয়ে হয়। একটি এয়ারলাইন্সে চাকরি করা চট্টগ্রামের ছেলে ফাহাদকে অবশেষে ডিভোর্স দিতে যাচ্ছেন পূর্ণিমা। ঢালিউডের এক শীর্ষ নায়ক এ খবরের সত্যতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পূর্ণিমা-ফাহাদের সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলছে।পূর্ণিমা তার এক প্রাক্তন প্রেমিকের কাছে ফিরে যেতে চাইছেন। যে কোনো সময় পূর্ণিমা তাদের ডিভোর্সের ঘোষণা দেবেন।
 

 ফিরছেন প্রভা...
নিবোনদন রিপোর্ট
মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ছেন আলোচিত-সমালোচিত মডেল-অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভা। মাঝখানে টানা প্রায় এক বছর গৃহবন্দি জীবনযাপনের পর সম্প্রতি নতুন স্বামীর হাত ধরে পাখা মেললেন তিনি। ২০১১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর মাহমুদ শান্তর সঙ্গে বিয়ের পর নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে তুলছেন। গেল সপ্তাহে স্বামী, পরিবারের সব সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শরীয়তপুরে গিয়েছেন তিনি। উদ্দেশ্য, ছোটখাটো বনভোজন কিংবা হানিমুন! প্রভা জানান, ৭ই জানুয়ারি শনিবার সারাটা দিন আমরা পদ্মার বুকে নৌকা নিয়ে ঘুরেছি। এর ফাঁকে খাওয়া-দাওয়া আর হই-হুল্লোড় তো ছিলই। অনেক দিন পর এমন আয়োজনে আমরা সবাই খুব খুশি। বিশেষ করে আমার কাছে মনে হয়েছে অনেকদিন পর পুরো আকাশটা একসঙ্গে দেখেছি, ঘ্রাণ নিয়েছি শুদ্ধ বাতাসের। নদীর বুকে নৌকায় বসে নিজেকে পাখির মতো স্বাধীন-সুখী মনে হয়েছে।এদিকে পদ্মার বুক থেকে ফিরে এসে আবারও যোগ দিয়েছেন শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রী প্রভা। প্রভা জানান, চলতি বছরেই নিজের ডিজাইনিং নিয়ে একটা এক্সিবিশন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, বিয়ের পর খুব শিগগিরি আবারও নাটকে ফেরার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। জানা যায়, এরই মধ্যে তিনি কোমর বেঁধে গ্ল্যামার ভূবনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই এরই মধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছেন বিভিন্ন নির্মাতার সঙ্গে। এর মধ্যে দু’-একজন নির্মাতার শুটিং লোকেশনেও দেখা গেছে নতজানু প্রভাকে। আরও জানা যায়, আবারও মিডিয়ায় ফেরার জন্য উদগ্রীব প্রভার পে রয়েছেন তার স্বামী এবং সাবেক প্রেমিক মাহমুদ শান্ত। তবে এখনও মিডিয়ায় ফেরার বিষয়ে সবুজ সংকেত মিলেনি প্রভার বাবা-মা’র প থেকে। তাতে কি? ব্যক্তিজীবনে অনেকটা ডেসপারেড প্রভা বাবা-মাকে তোয়াক্কা না করে আবারও ফিরবেন গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে- এমনটাই মনে করছেন অনেকে। উল্লেখ্য, একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, নতুন স্বামী মাহমুদ শান্ত প্রভার সাবেক প্রেমিক-স্বামী রাজিব এবং অপূর্বর অনেক আগে থেকেই ভালবেসে আসছিলেন।
সে সময় রাজিব-অপূর্বর ধারাবাহিক আকাশছোঁয়া প্রেমের উত্তাপে মাহমুদ শান্ত প্রভার কাছে অবহেলিত থাকলেও, এখন তার পুরোটা পৃথিবী শান্তকে ঘিরেই। তাইতো প্রভার নিকটাত্মীয় এবং সাবেক সহকর্মীদের অস্ফুট সুরে বলতে শোনা যায়- বাস্তবতা বড্ড বিচিত্র এবং নির্মম। যেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন প্রভা। যদিও সেই তিক্ত-নির্মম অভিজ্ঞতা থেকে প্রভা ঠিক কতটা শিা নিয়েছেন কিংবা নেবেন- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

কারিনা ও ক্যাটরিনা নিয়ে দ্বন্দ্ব
নিবোনদন রিপোর্ট
চলতি সময়ে বলিউড ফিল্মডোমে রাজত্ব করছেন কারিনা কাপুর ও ক্যাটরিনা কাইফ। এই দুই হিরোইনের দরোজায় পরিচালকদের লাইন লেগেই থাকে। এই দুই টপ হিরোইনের একজনকে পেলেই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায় ছবির বাণীজ্যিক সাফল্য। বলিউডের নামি দুই পরিচালক করন জোহর ও একতা কাপুর সম্প্রতি বিপাকে পড়েছেন কারিনা ও ক্যাটরিনাকে নিয়ে। কারণ এমন এক পরিস্থিতি তাদের সামনে তৈরি হয়েছে যে, কারিনা ও ক্যাটরিনার মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে তাদের বেছে নিতে হবে। কাকে বেছে নেবেন তারা, এই নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়েছেন তারা।২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওয়ানস আপুন এ টাইম ইন মুম্বাই’ ছবির সাফল্যের পর ছবিটির সিক্যুয়েল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরিচালক একতা কাপুর। সিক্যুয়েল নির্মাণে সম্প্রতি তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন বলিউডের আরেক খ্যাতিমান পরিচালক করন যোহর। এবার যৌথ পরিচালনায় নির্মিত হচ্ছে ‘ওয়ানস আপুন এ টাইম ইন মুম্বাই টু’ ছবিটি। ‘ওয়ানস আপুন এ টাইম ইন মুম্বাই টু ’ ছবির নায়িকা চরিত্রটির জন্য একজন শক্তিশালী ও আবেদনময়ী অভিনেত্রীর প্রয়োজন। তাই বলিউডের শীর্ষ স্থানের নায়িকাকে নিয়ে কাজ করার কথা চিন্তা করছেন ছবিটির দুই পরিচালক। কিন্তু মুশকিল হয়েছে পরিচালক দুজনের পছন্দটা দুই রকম। একতা কাপুরের ইচ্ছে বলিউডের আবেদনময়ী ক্যাটরিনাকে কাস্ট করবেন নায়িকা চরিত্রে। কেননা আবেদনময়ী ক্যাটরিনা অভিনয়েও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এছাড়া সৌভাগ্যবতী ক্যাটরিনার জাদু এ ছবিতেও পরবে এ আশাই করছেন একতা কাপুর। অন্যদিকে পরিচালক করন যোহর এ ছবিতে নায়িকা চরিত্রে চাচ্ছেন বেভো কারিনা কাপুরকে। এজন্য কারণও দেখিয়েছেন তিনি। কারিনা কাপুর ধার্মা প্রডাকশনে নিয়মিত অভিনয় করেছেন। এছাড়া কারিনার সৌন্দর্য ও অভিনয় যোগ্যতা সবার কাছেই প্রশংসনীয়। তাই নায়িকা চরিত্রে কারিনার চেয়ে ভালো পছন্দ আর কিছুই হতে পারে না বলে বিশ্বাস করন যোহরের। ‘ওয়ানস আপুন এ টাইম ইন মুম্বাই ’ ছবির মূল চরিত্রে অজয় দেবগণ অভিনয় করলেও ছবিটির সিক্যুয়েলে পরিচালকরা কাস্ট করেছেন বলিউড খিলাড়ি অয় কুমারকে। তবে নায়িকা চরিত্রটির দায়িত্ব কাকে দিচ্ছেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন দুই পরিচালক। কারিনা ও ক্যাটরিনার মুখোমুখি এ সংঘর্ষে বাজিমাত কে করছেন তা নিশ্চিত হওয়া যাবে পরিচালকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর। সেই সঙ্গে শক্তিশালী ও আবেদনময়ী অভিনেত্রী হিসেবে কে বেশি এগিয়ে তা প্রমাণিত হবে ভক্তদের কাছে।

নওশীনের রঙ্গিলা
নিবোনদন রিপোর্ট
ঐশী মধ্যবিত্ত, রণশীল পরিবারের একমাত্র মেয়ে। সারাণ পর্দা করে চলে, কখনও মাথা থেকে কাপড় পড়ে না। বাবা-মায়ের কাছে সে আদর্শ মেয়ে। প্রতিবেশীরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটির ঐশীকে চেনার উপায় থাকে না। বদলে যায় তার চালচলন পরনে তার লেটেস্ট মডেলের প্যান্ট, শার্ট, হেয়ার স্টাইল। সুদর্শন যুবকদের হƒদয়ে ঝড় তোলা ঐশী তখন আধুনিক একটা মেয়ে। রবিন নামের মধ্যবয়সী ব্যবসায়ীর সঙ্গে গভিড় সম্পর্ক তার। একদিন রবিনের গাড়িতে যাচ্ছিল ঐশী, ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালে একটা রিকশা পাশে এসে দাঁড়ায়। গাড়িতে ঐশীকে দেখে তার বাবা চমকে ওঠেন। ঐশী বাবা-মাকে বোঝাতে পারে, গাড়ির মেয়েটা সে হতে পারে না। আরেকদিন ঐশীর মামা একই অবস্থা দেখে। বাবা-মার সন্দেহ হয়। নাটকের মোড় ঘুরে যায় যখন অমিতের সঙ্গে ঐশীকে দেখা যায়। ত্রিমাত্রিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়, একটার পর একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটতে থাকে। এদিকে জামিলের সঙ্গে ঐশীর বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়। ঐশী জামিলকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নাটকীয় পদপে নেয়। বন্ধু অমিতকে সামলানোর জন্য ঐশী আবীরের সাহায্য নেয়। এরকম একটি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ধারাবাহিক নাটক ‘রঙ্গিলা। আজ থেকে নাটকটি প্রতি শুক্রবার ও শনিবার রাত ৯টা ৩০ মিনিটে একুশে টেলিভিশনে প্রচার হবে। আবদুস সালামের কাহিনী ও রিজওয়ান খানের চিত্রনাট্যে এ নাটকটি পরিচালনা করেছেন জুয়েল মাহমুদ। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমিরুল হক চৌধুরী, চিত্রলেখা গুহ, নওশীন, ঈশানা, শহীদুজ্জামান সেলিম, মীর সাব্বির, অবিদ রেহান প্রমুখ।

মিলি’র কারণে খুন!
নিবোনদন রিপোর্ট
মনপুরা খ্যাত অভিনেত্রী ফারহানা মিলির কারণে খুন হলেন সাংবাদিক ও জনপ্রিয় অভিনেতা হাসান মাসুদ। তবে বাস্তবে নয় নাটকে খুন হলেন হাসান মাসুদ। আর খুন করলেন ফারহানা মিল’র স্বামী। মিলির স্বামী হাসান মাসুদকে কৌশলে খুন করলেন, যাতে কেউ বুঝতে না পারে। ইন-হাইওয়ে নাটকের কাহিনতে দেখা যাবে মিডিয়া জগতের প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী ফারহানা মিলি নাটকের শুটিং শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে গাড়ির ড্রাইভার গাড়িটি ঠেলে পার্শ্ববর্তী একটি পাম্পে নিয়ে যায়। পাম্পের ম্যানেজার হাসান মাসুদ মিলির প্রেমিক ছিলো। ভালোবাসার চতুর্মূখী দ্বন্দ্বে মিলি এবং হাসানের মিল হয়নি। মিলির বিয়ে হয় মিডিয়ার প্রভাবশালী প্রযোজক মাহমুদুল হাসান মিঠুর সঙ্গে। মিলি বিয়ে করলেও হাসান মাসুদ বিয়ে করেননি। ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে মিলি ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে মেনে নিতে পারবেন না বলেই সে বিয়ে করেনি। মিলি বিবাহিত হলেও পুরনো প্রেমিককে পেয়ে পিছনের ইতিহাসের দিকে ফিরে যেতে চেষ্টা করে। দুজন দুজনের সুঃখ-দুঃখের নানা কথা শেয়ার করতে থাকে। আর এখানেই বাদ সাধে মিলির স্বামী মিঠু। সুচতুর ভাবে হাসান মাসুদ কে খুন করে। কারণ মিঠুর মনে ভয় ছিলো মিলি পূরণায় হাসান মাসুদের কাছে ফিরে যাবে। নাটকের চতুর্থ চরিত্র হচ্ছে মনস্বতান্তিক বিষয়টা। পুরো নাটকটি ফ্যাশব্যাকে দেখানো হবে। মনস্বতান্তিক এমন একটি কাহিনী নিয়ে নাটক বাণীয়েছেন রাইসুল তমাল। ফারহানা সালাম এর রচনা এবং রাইসুল তমালের পরিচালনায় ‘ইন-হাইওয়ে’ নাটকটির শুটিং শেষ। এখন যেকোনো একটি বেসরকারি চ্যানেলে প্রচারের অপোয় রয়েছে। ইন-হাইওয়ে নাটকে ফারহানা মিলি এবং হাসান মাসুদ ছাড়াও মাহমুদুল হাসান মিঠু অভিনয় করেছেন। ইন-হাইওয়ে সম্পর্কে ফারহানা মিলি বলেন, নাটকটি আমার নিজের কাছেও ভালো লেগেছে। আশা করি দর্শকদের ও ভালো লাগবে। রাইসুল তমাল ভাই একজন গুনি পরিচালক। ওনার মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ‘ট্রানজিস্টার’ নাটটিও একটি আলোচিত হয়েছিলো। রাইসুল তমাল বলেন, নাটকের কাহিনীতে দর্শক অন্য রকম স্বাদ পাবেন। কারণ এটি একটি ব্যাতিক্রমী বিষয়ের ঘটনা থেকে তৈরি করা হয়েছে। আমি দর্শকদের ঠকাতে চাই না বলেই নাটকটি ভালো করার চেষ্টা করেছি। বাকিটা দর্শক বলবেন।


শিমুর পথ চলা....
বিনোদন প্রতিবেদক
‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা হৃদয়ে সুখের দোলা.....’ জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী কনকচাপার এই গানটি গেয়ে গাও বাংলার গান প্রতিযোগী অনুষ্ঠানে প্রথম হলেন রংপুরের শিমু। পুরো নাম সাদিয়া আক্তার শিমু।
সম্প্রতি রাজধানীর পূর্বানী হোটেলে গাও বাংলার গানের চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে আধুনিক গানটি গেয়ে বিচারকদের মাতিয়ে তোলেন সাদিয়া আক্তার শিমু। চূড়ান্ত পর্বের বিচারক ছিলে সুরকার গীতিকার মোস্তাক আহম্মেদ,সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক মিল্টন খন্দকার। শিমুর গান শুনে মিল্টন খন্দকার বলেছিলেন, তুমি বাংলাদেশের ২য় কনকচাপা। দরদী কন্ঠের অধিকারীনি শিমুর বাড়ি রংপুর বিভাগের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা পাড়া গ্রামে।বাবা সুলতান আহমেদ মা মুক্তা বেগমে ২য় কন্যা শিমু রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী। শিমু তার মায়ের অনুপ্রেরনায় ২য় শ্রেণী থেকে সঙ্গীত ভূবনে প্রবেশ করেন।তার সঙ্গীত শিক সুজন বাবু মাধ্যমে সঙ্গীত চর্চা করেন। পরে গীতিকার ,সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক সামসুজ্জামান ভানুর কাছেও গানের তালিম নেন। সঙ্গীতের প্রতিভাবান শিল্পী খুজতে গাও বাংলার গান সারাদেশে অডিশন শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ মার্চ গাও বাংলা গানের অডিশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণ করে সাদিয়া আক্তার শিমু। এই অডিশনে ঢাকা থেকে বিচারক ছিলেন, সুরকার গীতিকার মোস্তাক আহমেদ, চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনও জালাল মুন্না। এই অডিশনেও গান গেয়ে বিচারকদের মুগ্ধ করেন শিমু। সে দিনের দুটি রাউন্ডে হাজারো প্রতিযোগীর মধ্যে ইয়েস কার্ড পেয়ে ঢাকায় আসেন শিমু। ঢাকার সেগুন বাগিচার কচিকাচা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দুটি অডিশন রাউন্ড চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ায় শিমুর। কিন্তু তার মায়ে আন্তরিক প্রচেষ্টায় হাল ছাড়েনি শিমু।সঙ্গীতের বিভিন্ন যন্ত্রের সঙ্গে তাল লয় সুর ঠিক রেখে গলা ছেড়ে গান গেয়ে বিচারকদের মন জয় করে। বিচারকরাও শিমুকে বিচার করতে ভুল করেনি। তাই সব বিচারকরা তাকে দিয়েছে সর্বাধিক মার্ক। বিচারকদের মার্ক নিয়েই শিমু জায়গা করে নেয় সেরা দশে। এরপর ফাইনাল রাউন্ডের জন্য অপো করতে থাকে শিমু। নিজেকে ফাইনাল রাউন্ডের জন্য তৈরি করতে বেতার শিল্পী আশুতোষ বর্মন আশীষে নিকট তালিম নেন। তাল লয় সুরে শিমু তার গলাকে সাজিয়ে উপস্থিত হোন ফাইনাল রাউন্ডের মঞ্চে। কোন ভয় ভিতি ছাড়াই দরদী কন্ঠে গেয়ে ওঠেন, কনকচাপার সেই জনপ্রিয় সিনেমার গানটি,তুমি মোর জীবনের ভাবনা হৃদয়ে সুখের দোলা। গানের সঙ্গে শিমুর অভিনয় ভঙ্গিমাটা ছিল বিচারকদের দোলা দেয়ার মত। যেন গানটিতে হারিয়ে গিয়েছিল কিছু সময়ের জন্য।তার অসাধারণ গায়কী ঢংয়ে বিচারকরাও হয়েছেন বিমোহিত। তাই বিচারকের রায়েই প্রথম স্থান অধিকার করেন শিমু। প্রথম হওয়ার অনূভুতি জানাতে গিয়ে সাদিয়া আক্তার শিমু বলেন, গানকে আমি মনে প্রানে ভালবাসি।আর আমি যে গানটি করি তা আন্তরিকভাবেই করার চেষ্টা করি। আজ গাও বাংলা গানে প্রথম স্থান অধিকার করার পেছনে গানের ওস্তাদসহ আমার মা ও নানীর অবদান বেশি। তারা আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছে।্এছাড়াও গাও বাংলার গানের আয়োজক ও বিচারকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। গান নিয়ে ভবিষ্যত ভাবনা কি জানতে চাইলে, সাদিয়া আক্তার শিমু বলেন, আমি গতানুগতিক গান গাইবো না। সস্তা মানের গান গেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই। কেননা সঙ্গীতের বাজারে অনেক শিল্পী প্রতিদিন আসে। আবার অল্পকিছু দিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়। আমি এমন করে হারিয়ে যেতে চাই না। আমি সুস্থ সঙ্গীত চর্চার মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়াতে চাই। ভাল গান গেয়ে সবার মন জয় করতে চাই। এমনকি গান গেয়ে দেশের সেবা করে যাবে বলে জানায় শিমু। এ জন্য সবার কাছে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছে। 

 অসম প্রেমের পরিণতি টানছেন হৃদয় খান
বিনোদন ডেস্ক
এই সময়ের মিউজিক ক্রেজ হৃদয় খান। বছর তিনেক আগে তার একটি মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে কাজ করেন সুজানা। সেই সূত্রে হৃদয় খান ও সুজানার ঘনিষ্ঠতা। দীর্ঘদিন তারা নিজেদের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে রোমান্টিক সম্পর্ক। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে ঘোষণা দেবেন তারা। হৃদয় খানের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাম্প মডেল হিসেবে সুপরিচিত সুজানা বয়সে হৃদয়ের প্রায় ৭ বছরের বড়। হৃদয় খান সদ্য টিনএজ পার করেছেন। বয়স এখনও ২১ ছাড়িয়ে যায় নি। তাতে কী ? প্রেম তো কোনো নিয়ম মানে না। তাই হৃদয়-সুজানা জড়িয়ে গেছেন অসম প্রেমে। হৃদয় খান লাইম লাইটে এসেছেন প্রায় তিন বছর হলো। গত দুবছর ধরে হৃদয় খানের প্রায় সব স্টেজ প্রোগ্রামে দেখা যায় সুজানাকে। হৃদয় খানের পোশাক-আশাক ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি কোন প্রোগ্রামে কোন গানটি গাইবেন তা ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্বটাও অনেকদিন ধরে পালন করছেন সুজানা। হৃদয় খানের বাবা সঙ্গীত পরিচালক রিপন খানও ছেলে হৃদয় খানের হৃদয় ঘটিত সম্পর্কের ব্যাপারটি জানেন। সেলিব্রিটি ছেলের সিদ্ধান্তে বাবারও আছে পূর্ণ সম্মতি। হৃদয় খানের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৭ জানুয়ারি এসিআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিতব্য এক কনসার্টে হৃদয় খানের সাথে একই সঙ্গে মঞ্চে উঠবেন সুজানা। হৃদয় খান গাইবেন এবং সুজানা তাতে পারফর্ম করবেন। পারফর্মেন্স শেষে অডিয়েন্সের সামনে তারা দুজন ঘোষণা দিবেন বিয়ে করার। তাদের এই পরিকল্পনার কথা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজের কাছে ফাঁস করে দিয়েছেন দুজনেরই খুব কাছের এক বন্ধু। সুজানা প্রায় আট বছর আগে র‌্যাম্প মডেল হিসেবে মিডিয়ায় পা রাখেন। বড় বড় অনেক ফ্যাশন শোতেই তিনি ক্যাটওয়াক করেছেন। একটি সফট ড্রিংক্সের বিজ্ঞাপন চিত্রে অংশ নিয়ে তিনি বেশ পরিচিতি পান। সুজানার অবশ্য আগে একবার বিয়ে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সামির নামের এক যুবককে ২০০৬ সালে বিয়ে করেন সুজানা। তবে তাদের সংসার একবছরও টেকসই হয় নি। সদ্য টিনএজ পার করা গায়ক ও সুরকার হৃদয় খানের সঙ্গে এর আগে একজন সুপরিচিত ড্রামবাদকে শ্যালিকার গভিড় সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা গেছে। 

Year-18 # Issue-47 # 8 January 2012




বাংলার কৃষক ও বঙ্গবন্ধু
কৃষির উপকারিতা ও ফজিলত অপরিসীম। এ সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসুলে পাক (সাঃ) বলেছেন, যে মুসলমান গাছ রোপণ করে কিংবা ফসল ফলায় এবং পাখি, মানুষ ও জীবজন্তু তা থেকে নিজেদের আহার যোগাড় করে, এ কাজ তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই কাজের মাধ্যমে সে ব্যক্তি সওয়াব লাভ করে। এ হাদিসের ব্যাখ্যাদান প্রসঙ্গে শেখ বদরুদ্দিন আইনি বলেন, গাছ রোপণকারী এবং ফসল উৎপাদনকারীর এই কাজের দ্বারা সওয়াব লাভের নিয়ত না করলেও সে সওয়াব পেতে থাকে। এমনকি, সে যদি বৃ রোপন করে এবং ফসল করে বিক্রিও দেয় তবু এটা তার প সদকা হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, তার এই কাজের ফল আল্লাহ্র সৃষ্ট জীবের জীবিকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি কাজ বিশ্ব মানবের প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার প থেকে এক বিরাট করুণা ও দয়া। কৃষি ও চাষাবাদ মুসলিম-অমুসলিম সবার জন্যই সমানভাবে কল্যাণকর ও মঙ্গলময়। কৃষকের নিয়ত বা ল্য-উদ্দেশ্য ছাড়াও কৃষি কাজের মাধ্যমে আল্লাহ্ পাকের সৃষ্টি-জীবরা উপকৃত ও লাভবান হয়। আমাদের হানাফি মাজহারের কোনো কোনো আলেমের মতে, ব্যবসা ও শিল্পের চেয়েও কৃষি উত্তম। যুগের অন্যতম দার্শনিক শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রঃ) জীবনোপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। তার মতে, ‘যে দেশে কৃষির উপকরণ রয়েছে, সে দেশে যদি তার প্রতি উপো প্রদর্শন করা হয়, তাহলে সেখানকার সামাজিক অবস্থা কখনো সুষ্ঠু থাকতে পারে না। সে দেশের ধ্বংস ও অকল্যাণ অবশ্যম্ভাবী।’
সুতরাং কৃষি খুবই জনকল্যাণকর একটি পেশা। আর এ পেশার সঙ্গে বাংলার মানুষ জড়িত ও পরিচিত সদর অতীতের প্রাচীন যুগ থেকেই। আর এ অর্থেই এদেশের বাঙালি জাতি কৃষিনির্ভর। কৃষিই তাদের প্রথম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল উৎস। এর মধ্যে ধান হলো বাংলার প্রধান অর্থকরী ফসল। এ ব্যাপারে চৌদ্দ শতকে বাংলায় ভ্রমণকারী চীনের বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বর্ণনা করেন, ‘এ দেশে তখন প্রচুর ধান জš§াত।’ বার্নিয়ার লিখেছেন, ‘যদিও অনেকের মতে পৃথিবীর মধ্যে মিশরে সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপন্ন হয়, প্রকৃতপে এ সুনাম বাংলাদেশের প্রাপ্য। এদেশে এত ধান উৎপন্ন হয় যে, তা বহু দেশে রফতানি করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সুলতানী আমল থেকে অগ্রসর হতে থাকলেও তা আরো সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে মুঘল আমলে। এ আমলে বাংলার জনসংখ্যা ছিল দেড়-দুই কোটি মাত্র। লোকসংখ্যার তুলনায় ফসল উৎপন্ন হতো অনেক বেশি। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বর্ণনা মতে, বাংলার মাটি ছিল যথেষ্ট উর্বর। এ দেশের উদ্বৃত্ত চাল উত্তর ও দণি ভারত, শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপে রফতানি হতো। এ ছাড়াও আখ, তুলা, সর্ষে, পান, গম, মরিচ, হলুদ, আদা, আফিম, পাট ও নল চাষ হতো। এসব কৃষিজাত উৎপাদিত ফসল এবং এসবের দ্বারা তৈরিকৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও মালামাল দণি ভারত, আরব, ইরাক, ইরান, ইউরোপ আর চীনসহ পৃথিবীর নানা দেশে রফতানি করা হতো। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো, পরবর্তীতে ইংরেজ কোম্পানি সরকারের সৃষ্ট নীতি ও কুফলের কারণে কৃষিেেত্র এক চরম অবনতি ঘটে। আর এরই ফলে ইংরেজি ১৭৭০ সালে এক ভয়াবহ দুর্ভিে বাংলার কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং সীমাহীন তিগ্রস্ত হয়। কোম্পানি সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মচারী রিচার্ড বেচারের মতে, এ দুর্ভিকেষ বাংলার প্রায় এক কোটি বা এক-তৃতীয়াংশ লোক মারা যা। এ দুর্ভিে জের কাটাতে বাংলার মানুষের বিশ-পঁচিশ বছর লেগে গিয়েছিল। এ ধরনের চরম দুর্ভি এদেশে এরপরে ১৯৪৩ সালে আরো একবার হয়েছে। এ সময়ের দুর্ভিে সরকারি জরিপে পনর লাখ আর বেসরকারি মতে পঁয়ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ প্রাণ ত্যাগ করে। এ দুর্ভিরে কারণগুলো হলো, দেশে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রপ্তানি শুরু করে দেয়া। এ সুযোগে অসাধু, লোভী এবং মনাফাখোর ব্যবসায়ীরা খাদ্যশস্য গুদামজাত করে। তাছাড়া দেশে অনাবৃষ্টির ফলে বাংলার ফসল উৎপাদনও কমে যায়। এমনকি, এ দুর্ভিরে জন্য বাংলা সরকার কর্তৃক তৎকালীন মন্ত্রিসভা ও মুসলিম লীগকেও দায়ী করা হয়েছিল। তদ্রƒপ, পাকিস্তানি আমলেও পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ মারাÍক অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়। এদেশ থেকে অবাধে অর্থ পাচারের কাজ চলত। আর এভাবেই দেশের সমুদয় আয় পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেত। অপরদিকে উদ্বৃত্ত সকল আর্থিক সঞ্চয়ও পশ্চিম পাকিস্তানে জমা থাকত। পাট এ দেশের প্রধান রফতানি পণ্য। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার দুই-তৃতীয়াংশই অর্জিত হতো এদেশের পাট থেকে। কিন্তু পাটের নায্যমূল্য পাট চাষিরা পায়নি, নানা টালবাহানা ও অজুহাত দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানেই।
বাঙালির ওপর পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক এবং সামরিক স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি এসব অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের এক সম্মেলনে ৬ দফা দাবি নামে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঐতিহাসিকভাবে এ কর্মসূচিকে ৬ দফা আন্দোলন বলা হয়। আর এ ৬ দফাই বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে সমর্থন লাভ করে। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ৬ দফার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘৬ দফা বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মজুর, মধ্যবিত্ত তথা আপামর মানুষের মুক্তির সনদ, ৬ দফা শোষকের হাত থেকে শোষিতের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের বলিষ্ঠ হাতিয়ার, ৬ দফা মুসলিম-হিন্দু-খ্রীস্টান-বৌদ্ধদের নিয়ে গঠিত বাঙালি জাতির স্বকীয় মহিমায় আÍপ্রকাশ আর আÍনির্ভরশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি।’ বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা কর্মসূচি।’ ৬ দফার সীমাহীন জনপ্রিয়তায় পাকিস্তান সরকার ভীত হয়ে বাঙালির এ আন্দোলনকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে এর অপব্যাখ্যা ও মিথ্যাচার করতে থাকে। অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর ৬ দফা আন্দোলনকে প্রতিহত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার ভিন্ন কৌশল অবলম্বন অর্থাৎ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অবশেষে ছাত্র ও গণআন্দোলনের মুখে পাক সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়ে থাকলেও ৬ দফাকে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক দাবিকৃত ১১ দফার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই ১১ দফা কর্মসূচিতে কৃষক-শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবিও যোগ করা হয়েছিল। তার পরই শুরু হয়ে যায় ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এবং এ আন্দোলনের পর সত্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয়ে পাক সরকার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে  এবং নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। নির্বাচনের পর খোদ পাক প্রেসিডেন্ট  ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের ‘ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ বলে  থাকলেও এ দেশ এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তিন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন গুরুত্বরভাবেই। তারপর সংঘটিত হয়  একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এযুদ্ধের শুরুর  ২৫ মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলেও  তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ে যাওয়া হয় ২ এপ্রিল। সেখানকার সামরিক আদালতে ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবিতে দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। অবশেষে জনতার তীব্র চাপের মুখে পাক সরকার বাহাত্তরের ৮  জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয় এবং ১০ জানুয়ারি তিনি দিল্লির সমাবেশ শেষে স্বদেশে ফিরে আসেন। এরপর শুরু হয়  বঙ্গবন্ধুর সদ্য স্বাধীন ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়ার সুদৃঢ় প্রত্যয় এবং সেই ‘রোড ম্যাপ’ অনুযায়ীই তিনি সামনের দিকে এগোতে থাকেন। তবে ধর্মের লেবাসধারীদের চেয়ে বঙ্গবন্ধুর ইমানি-মজবুতি ছিল অনেক বেশি। তিি নতো সারা জীবনই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা আর অন্যায়ের মূল্যোৎপাটন করতেই আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেছেন। তার বক্তৃতা ছিল, ভিার বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মদ ও নোংরা জিনিসের বিরুদ্ধে। তিনি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য সুগভীর ভালোবাসা দিয়ে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন তার দরাজ গলের বিভিন্ন ভাষণ-বক্তৃতায়, আলাপচারিতায়। বলেছেন, ‘ভাইয়েরা জাতীয় আমার বোনেরা আমার, ভিুক জাতির ইজ্জত নেই। একটা জাতি যখন ভিুক  হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতে, আমাকে খাবার দাও আমাকে টাকা দাও সেই জাতির নেতা থাকতে চাই না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট পরা, কাপড় পরা ভদ্রলোক তাদের  কাছেও চাই জমিতে গিয়ে ডবল ফসল করুন। এ প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে  ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডবল ফসল করতে হবে। যদি ডবল করতে পারি আমাদের অভাব ইনশাল্লাহ্ হবে না। ভিুকের মতো হাত পাততে হবে না। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর তার বৃক্তৃতার দুর্নীতিবাজ খতম করার স্লোগান দিয়েছেন, কথা বলেছেন। এই দুর্নীতিবাজ বলতে তিনি কৃষকদের কথা, শ্রমিকদের কথা বলেননি। বলছেন, যারা ঘুষখোর, ব্লাক মার্কেটিং করে, বিদেশি এজেন্ট হয়, বিদেশে টাকা পাচার করে এবং হোর্ড করাসহ নানা দুর্নীতিতে জড়িত রয়েছেন তাদের কথা। এমনকি, দুর্নীতিবাজ বলতে বঙ্গবন্ধু দেশের শতকরা বিশজনের পাঁচজন শিতি লোককেই বুঝিয়েছে, দায়ী করেছেন। বঙ্গবন্ধু এসব শিতি ঘুষখোর দুর্নীতিবাজকে আÍশুদ্ধির কথা বলেছেন, চরিত্র সংশোধনের তাগিদ দিয়েছেন, দায়ী করেছেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নয়, একজন কৃষক, শ্রমিক এবং রিকশাওয়ালাকেও সম্মান দেখিয়ে কথা বলতে বঙ্গবন্ধু শিতি চাকরিজীবীদের পথ নির্দেশ করেছেন। বঙ্গবন্ধু বিশাল জনসমাবেশে তার ভাষণ-বক্তৃতা দেয়া ছাড়াও সরকারি কোনো প্রতিনিধি দল অথবা ব্যক্তিগত কাউকে পেলেই উদ্ধৃতি-বিবৃতি উপমা, উদাহরণ দিতে গিয়ে মনের এসব হƒদয় নিংড়ানো কথাবার্তা জানাতেন। বলতেন তার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কথা, সোনার মানুষের কথাও। বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি দেশের কৃষকদের পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। যেন কৃষকরা তার প্রাণ। কৃষকদের সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘আমি সোনার মানুষের কথা বলি। আমার কৃষকরাই শুধু সোনার মানুষ। তারা সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল ফলায়, ঘরবাড়ি বানায়, নৌকা চালায়, তবেই না আমরা বাবু সেজে পায়ের ওপর পা তুলে আরো কত বড় হব তার খোয়াব দেখি। দৃঢ় আবেগ আর বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধু আরো বলেছেন ‘বাঙালি খুব গবির, দরিদ্র আমার ভাষায় দুঃখী। আমি যতটা ইতিহাস পড়েছি, তাতে জেনেছি। হাজার বছর ধরেই বাঙালি দুঃখী-অভাবী। তার বিত্ত  নেই, বেসাত নেই। হাতে পয়সা  নেই।... মনে হয় শায়েস্তা খার আমলেও বাঙালি কাঙালিই ছিলে। বাঙালির বিশেষ করে কৃষিজীবী মুসলমান বাঙালির হাতে কোনো কাঁচা পয়সা জুটত। এই টাকা দিয়ে আমাদের বাবা-চাচারা ইলশা মাছ কিনে আনতেন। মা-চাচির জন্য শাড়ি আর নিজের জন্য কিনতেন লুঙ্গি। আমাদেরও নতুন কাপড় জুটত। বছরে পাটের  মৌসুমে এই একবারই। এই তো বাঙালি মুসলমানের অর্থনৈতিক অবস্থা।’ বঙ্গবন্ধুর কৃষক ভাবনা আর কৃষকপ্রীতি আজ দেশে অনেকাংশেই সার্থকতা লাভ করেছে, ফলপ্রসূ হয়েছে। জানা যায়, বর্তমান দেশের কোনো কোনো এলাকায় ‘ডিজিটাল কৃষি বিপ্লব’ ঘটেছে। মানসম্মত ফসল উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কৃষি কাজে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ভেষজ কীটনাশক ও কম্পোস্ট সারের ব্যবহারও নিশ্চয়তার পথে এগোতে যাচ্ছে। দেশের রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষির এ ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হয়েছে। এ ব্যাপারে নাকি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কৃষি সম্প্রসারণ শিা’ বিভাগ সহযোগিতা দিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আজ এভাবে কৃষির মান্নোয়ন এবং কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন হলেই বঙ্গবন্ধু পরলোকগত আÍা শাস্তি পাবে, সুখ পাবে। তার সর্বশেষ ‘বাকশাল কর্মসূচি’ দেয়াকেও দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের জন্য সীমাহীন কল্যাণ সাধনকারী দল বা সংগঠন মনে করেছিলেন। আমরা জানি, মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা, চেতনা তাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যায়, বড় বানায়। এেেত্র বঙ্গবন্ধুর অবস্থাটাও ছিল তাই। তিনি বাঙালি জাতির অতিশয় সুখ-সমৃদ্ধির জন্য জীবনের সুদীর্ঘ প্রায় তিন যুগ রাজনীতি করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, ভেবেছেনও। রাষ্ট্রীভাবে মতা গ্রহণের পর থেকে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে ধাপে ধাপে এগোতে এগোতে এক পর্যায়ে সর্বশেষ ও ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটিই তার জন্য বড় কাল হয়ে গিয়েছিল। আর এ জন্য বঙ্গবন্ধু খন্দকার মোশতাকসহ সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার রোষানলে পড়েন এবং তারা তাকে সপরিবারে হত্যা করে। বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাকশাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি ছিল দেশের জন্য একটি মহত উদ্যোগে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহে নেই। কিন্তু মোশতাক গংরাসহ ঐসব উচ্চাভিলাষী সেনাবাহিনীর লোরো জানত না যে, বাহ্যিকভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের নানা মতে গরমিল  থাকলেও বাকশালের মাধ্যমেই হয়ত সাধারণ জনগণের মধ্যে দেশে-শান্তি সুখ ফিরে আসতে পারত, নিরাপদ আবাসভূমিও গড়ে উঠতে সহায়ক হতো।

পরিবহন খাতে শৃংখলা আসুক
নিজস্ব প্রতিবেদক
যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ওবায়দুল কাদের পরিবহন খাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা জনমনে কিছুটা হলেও প্রত্যাশার জš§ দিয়েছে। যদিও রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে ট্রাফিক ব্যবস্থায় অনিয়ম ও স্থবিরতা দূর করে পরিবহন খাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে যানজট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। যোগাযোগমন্ত্রী তথা সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে তা করা সম্ভব বলে মনে করি আমরা। ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা এ সময়ে পরিবহন খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। সরকার জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে ঘন ঘন এবং পরিবহন খাতে প্রতিবারই এর প্রভাব পড়ছে। সরকারিভাবে ভাড়া বাড়ানো না হলেও বাস মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন ইচ্ছামতো। আর যে েেত্র সরকার নতুন ভাড়ার হার নির্ধারণ করে দিচ্ছে, সেেেত্র তা মানছেন না অনেক পরিবহন মালিক। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহনের খরচ বেড়ে যায় সন্দেহ নেই। এেেত্র ভাড়া যদি বাড়াতেই হয়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির হারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তা বাড়াতে হবে। সঠিকভাবে সে হিসাব-নিকাশ করেই নির্ধারণ করতে হবে নতুন ভাড়া। অযৌক্তিক হারে ভাড়া বৃদ্ধি করা হলে তা যাত্রীদের ভোগান্তির কারণ হবে। ফলে যাত্রীদের সঙ্গে বাসচালক, কন্ডাক্টর ও হেলপারদের বচসা লেগেই থাকবে। গত ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির পর আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস ভাড়া বাড়ানো হলেও ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীতে চলাচলরত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানো হয়নি। তা সত্ত্বেও নগরীর বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বাস ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সিএনজির দাম বাড়ানো না হলেও কোন কোন রুটে সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এেেত্র সরকারি নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন যোগাযোগমন্ত্রী। এর যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে চায় মানুষ। গত বছর মে মাসে সিএনজির দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন খাতে ভাড়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল চরম নৈরাজ্য। সিএনজিচালিত বাস মালিকরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অযৌক্তিভাবে। এর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণÑ কোন কিছুতেই কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাস মালিকদের নির্ধারিত ভাড়াই বহাল থেকেছে। আমরা আশা করব, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী কঠোর ভূমিকা পালন করবেন। শুধু বাস নয়, ট্যাক্সিক্যাব ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোও যাত্রী হয়রানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যাতে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী যে কোন গন্তব্যে যেতে এবং মিটার অনুযায়ী ভাড়া নিতে বাধ্য হয়, সে ব্যাপারেও কঠোর পদপে কাম্য।
যান চলাচলে শৃংখলা আনতে নগরীর যানবাহনগুলোকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে কঠোরভাবে। অন্তত নগরীর প্রতিটি বড় রাস্তার মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশে লোকবলের অভাব থাকলে তা অবিলম্বে দূর করা প্রয়োজন। ট্রাফিক পুলিশের জন্য উন্নত প্রশিণের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি দূর করতে হবে এ খাতে বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি। পরিবহন খাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নিয়েছেন যোগাযোগমন্ত্রী, আমরা তার সাফল্য কামনা করি। 

বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক: আব্দুর রাজ্জাক
অরুণ ব্যানার্জী
আওয়ামী লীগ একটি সংস্কারপন্থি দল। ১৯৪৯-এর আওয়ামী মুসলিম লীগ ’৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি উঠে আওয়ামী লীগ হয়েছে। ’৬৬ তে আইয়ুব খানের লাহোরে আহূত সর্বদলীয় বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা উত্থাপন করেন। কিন্তু তিনি দলীয় বৈঠকে ৬ দফা দাবি পাস করতে পারেননি। অথচ সেদিন মাজাহারুল হক বাকী ও আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের সভায় তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে রূপান্তরিত করেন গণদাবিতে। আওয়ামী লীগের সংস্কার কর্মসূচির কারণেই স্বায়ত্তশাসনের দাবি রূপান্তরিত হয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। দেশ স্বাধীনতার পরেও বঙ্গবন্ধুর বিপ্লবের কর্মসূচি সংস্কারেরই অংশ। আমার মতে জননন্দিত নেতা আব্দুর রাজ্জাক বা অন্য নেতারা দলে  সংস্কারের প্রশ্ন তুলে অন্যায় কিছু করেননি। তাকে দলে  গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা মন্ত্রিসভায় স্থান না দিয়ে শুধু দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। দেশ, জাতি ও জনগণকে এর মাসুল দিতে হয়েছে। আগামী দিনে ইতিহাস নিশ্চয় এর মূল্যায়ন  করবে। টেলিভিশনের পর্দায় মানুষের ঢল নামার ছবি দেখছিলাম। সে ছবি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ছবি। একজন রাজনীতিবিদের মৃত্যুর কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর দৃশ্য দেখছিলাম। তিনিই সংগ্রামী জননেতা আব্দুর রাজ্জাক। পাকিস্তানের ইসলামী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক লড়াকু সৈনিক। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক প্রাণপুরুষ। বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের একু তেজোদ্বীপ্ত কণ্ঠ। সর্বোপরি ভোগ নয়, ত্যাগের মহিমায় দেদীপ্যমান ছিলেন আমাদের অনেকেরই রাজ্জাক ভাই। পাকিস্তানে সর্বপ্রথম সামরিক শাসন আসে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর। রাজ্জাক ভাই ১৯৫৮-৬০ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্র। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী মনোভাব থেকে তার মনে ছাত্র রাজনীতির উšে§ষ ঘটে। তিনি যুক্ত হন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে। ষাটের দশক তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র রাজনীতির এক সুবর্ণ অধ্যায়। এই দশকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে শেখ ফজলুল হক মণি, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সিরাজুল আলম খান, আসমত আলী খান, ওবায়দুর রহমান, মাজাহারুল হক বাকী, আব্দুর রাজ্জাক, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, আমিনুল হক বাদশা, আল মুজাহিদী, তোফায়েল আহমদ, স্বপন চৌধুরী, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজান সিরাজ, আসম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নাসিরুল হক বাচ্চু, লতিফ সিদ্দিকী প্রমুখ একঝাঁক তরুণ নেতৃত্বের অগ্রভাগে ছিলেন। এর মধ্যে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মূলধারায় রাজনীতির সঙ্গে একটানাভাবে সবাই যুক্ত ছিলেন না। নেতৃত্বের মোহ, চটকদারি স্লোগান, অর্থের হাতছানি তথা বিভ্রান্ত রাজনীতির কানাগলিতে অনেকেই পথ হারিয়েছেন। শেখ ফজলুল হক মণি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, খালেদ মোহাম্মদ আলী প্রমুখ কিছু নেতা রাজনীতির মূল স্রোতধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ও আছেন। আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আবাসিক ছাত্র হিসেবে যুক্ত হন ফজলুল হক হলের সঙ্গে। তদানীন্তন সময়ে ফজলুল হক হল ছিল ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের আমলে আব্দুর রাজ্জাক হামিদুর  রহমানের শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তার আন্দোলনমুখী ভূমিকার কারণে ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের ১৯৬২-৬৩ সালের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সহসম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি, সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরিফ আহমেদÑ এই তিন নেতা সম্মিলিতভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একটি নিউক্লিয়াসের জš§ দেন। ওই নিউক্লিয়াসের মূল সুর ছিল পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে দেশকে স্বাধীন করে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। যার দরুন ১৯৬৬-৬৭ ও ১৯৬৭-৬৮ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে আব্দুর রাজ্জাক সারাদেশের জেলা ও মহকুমা শহর সফর করেন। তিনি ছাত্রলীগের বিশ্বস্ত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে স্বাধীনতার বীজ মন্ত্র সঞ্চারিত করেন। পরবর্তীতে এই নিউক্লিয়াসের নাম দেয়া হয় বামুবা (বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনী) ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোনেম খানের সমাবর্তনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত ও গ্রেফতার হন। এ সময় তিনি ছিলেন ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। তিনি অন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ওই বহিস্কার আদেশের বিরুদ্ধে রীট মামলা দায়ের করেন। মহামান্য হাইকোর্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বহিষ্কারাদেশকে বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে আপিল মামলা দায়ের করেন। ওই  আপিল মামলায় মহামান্য আদালত নিু আদালতের আদেশ বহাল রাখে। জাতীয় রাজনীতির ক্রান্তিলগ্নে তিনি ছাত্রলীগ রাজনীতির সাধারণ সম্পাকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ডিক্টেটর আইয়ুব খান ‘অস্ত্রের ভাষা’ প্রয়োগ করে ৬ দফার জবাব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্জাক ভাই তার সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে সংগঠিত করেছেন ছাত্র সমাজকে। পাকিস্তানি শাসকদের অর্থনৈতিক প্রশাসনিক ও সামাজিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন জনসভায়। তার জ্বালাময়ী বক্তব্য কাঁপন সৃষ্টি করেছে পাকিস্তানি শাসক ও কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের মনে। ’৬৬-এর ৭ জুন তার ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতির ইতিহাসে থাকবে সমুজ্জ্বল হয়ে।
রাজ্জাক ভাই সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন। লেখাপড়া ও ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরও তিনি মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতেন। ফজলুল হক হলের সেক্রেটারি থাকাকালে তিনি এক দিন ফজলুল হক হল থেকে দুপুরের শো’ তে সিনেমা দেখতে চলে আসেন গুলিস্তান সিনেমা হলে। হঠাৎ করে সিনেমা স্লাইডে দেখানো হয় ঃ রাজ্জাক তোমার মা অসুস্থ তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো। ইতি তোমার বাবা ইমামউদ্দিন, গ্রাম দক্ষিণ ডামুড্যা, জেলা ফরিদপুর। স্লাইড দেখে তিনি বুঝতে পারেন তার পেছনে গোয়েন্দা দফতরের লোকজন সক্রিয় রয়েছে। সিনেমায় ইন্টারভ্যাল দিলে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে তখনই গ্রেফতার হন রাজ্জাক ভাই। এই ঘটনার দীর্ঘদিন পর তিনি আমাকে বলেছিলেন কেবলমাত্র আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মী জানতেন ওই দিন এক সময় আমি গুলিস্তান সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাব। কিন্তু তিনি ছিলেন ওহঃবষষরমবহপব উবঢ়ধৎঃসবহঃ-এর বেতনভোগী এজেন্ট। তার ওই বন্ধু পরবর্তীতে দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং খোন্দকার মোস্তাক আহমদের ডেমেক্রেটিক লীগ করতেন। এই ঘটনা তার মনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে, যা তাকে রাজনৈতিক জীবনে বাস্তববাদী হতে সহায়তা করে। মাজাহারুল হক বাকী, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, সিরাজুল আলম খান, আল মুজাহিদী, কাজী আরেফ আহমেদ প্রমুখের মতো সৃজনশীল নেতা দল ত্যাগ করে ছিটকে পড়লেও তিনি বিচ্যুত হননি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে। ১৯৬৬ সালে তিনি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক  লীগের সভাপতি মনোনীত হন। ’৭০ -এর নির্বাচনে প্রাক্তন ছাত্রনেতা হিসেবে দেশের বিভিন্ন মহকুমা ও জেলা সফর করে জনমত গঠনে সহায়তা করেন। ’৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্সে ঐতিহাসিক ভাষণের আগে ও পরে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্ব যেমন পালন করেন, তেমনি তাকে পৌঁছিয়ে দেন নিরাপদ গোপন স্থানে। ’৭১-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু রাজ্জাক ভাই ও মণি ভাইকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর কাছ থেকে সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করে কলকাতা পাঠিয়ে দেন বাড়ি ভাড়া করার জন্য। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ছিল অসামান্য। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন দায়িত্ববান সংগঠক। রাজ্জাক ভাই ভারতের  মেঘালয়ে মুজিব বাহিনীর ৪ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তিনি মুজিব বাহিনীর একজন সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধাদের একজন প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি দেরাদুনে ভারতের সেনাবাহিনীর জেনারেল উবানের কাছে নিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ। রাজ্জাক ভাই মুজিব বাহিনী গঠনের অন্যতম রূপকার ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তার øেহধন্য ও বিশ্বস্ত রাজ্জাক ভাইকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। একটি  স্বাধীন দেশে ঔপনিবেশিক আমলের শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে না এই বিবেচনা মাথায় রেখে বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। গঠন করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সেক্রেটারি জেনারেল হন মো. আব্দুর রাজ্জাক। অপর দু’জন সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন আজকের রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও যুবনেতা ফজলুল হক মণি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন সে সময় আব্দুর রাজ্জাকের বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতীক্ষা সততা তথা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার কারণে তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সেই দুঃসহ দিনগুলোতে সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে ও ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর আবার তিনি গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এতে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিনকে সভাপতি ও আব্দুর রাজ্জাককে সম্পাদক করে  একটি  কমিটি গঠিত হয়। অপর প্যানেলে আব্দুল মালেক উকিলকে সভাপতি ও মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সম্পাদক করে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আরেকটি কমিটি। ১৯৭৮ সালে উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে দলের কেন্দ্রীয় বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এতে আব্দুল মালেক উকিল সভাপতি ও আব্দুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। দলের এ দুঃসময়ে তিনি গ্রহণ করেন কাণ্ডারীর ভূমিকা। ১৯৮১ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি আবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের  পদ অলংকৃত করেন। এ সময় দলকে আসন্ন ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করতে রাজ্জাক ভাই ড. কামাল হোসেনকে দিয়ে শেখ হাসিনাকে প্রথমে দলের প্রাথমিক সদস্য ও পরে সভাপতির প্রস্তাব করেন। তার এ প্রস্তাব অধিবেশনে গৃহীত হয়। এ থেকে বোঝা যায় আওয়ামী লীগের দুর্দিনে তার দুঃসাহসিক ভূমিকার কথা। ১৯৮৩ সালে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর ১৯৯১ সালে রাজ্জাক ভাই আবার আওয়ামী লীগে ফিরে  আসেন। তিনি ১৯৭০, ৭৩, ৯১, ৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। রাজ্জাক  ভাই স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ১৫ দলের অন্যতম রূপকার ছিলেন। পরবর্তীতে ৮ দল ৭ দল ও ৬ দলেরও ছিলেন অন্যতম সমন্বয়কারী। ৯২ সালে জামায়াত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযমসহ  যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলনে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম রূপকার ও সংগঠক ছিলেন তিনি। যুদ্ধাপরাধী  বিরোধী আন্দোলনে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, রাশেদ খান মেমন. আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমদ ও আহাদ চৌধুরী প্রমুখ নেতৃত্বের কারণে গতিময়তা পায়। ৯৬ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী ছিলেন। তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কারণেই সেদিন ভারতের সঙ্গে সফল ফারাক্কা পানি চুক্তি করা সম্ভব হয়েছিল। ২০০৯ সালে ২৫ ফেব্র“য়ারি বিডিআর বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহ দমনে যেসব নেতা পরামর্শ ও সাহস দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সহায়তা করেছিলেন তার মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক অন্যতম।
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতি একটি পেশা। কিন্তু রাজ্জাক ভাই রাজনীতিকে গ্রহণ করেছিলেন সেবার ব্রত হিসেবে। আমাদের এ উপমহাদেশে এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি রয়েছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ খুব সৌখিন ব্যক্তি ছিলেন। পেশায় ব্যারিস্টার এ রাজনীতিবিদের কাপড় আয়রন হয়ে আসত প্যারিস থেকে। কিন্তু তিনি নিজের কলকাতার বাড়িটি তার রাজনৈতিক দল কংগ্রেসকে দান করেন। আইনজীবী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কলকাতায় প্রচুর আয় করতেন। কিন্তু গরিব-দুঃখী অনেক মানুষকে দানও করতেন। অনেকদিন এমন হতো যে প্রচুর উপার্জন করার পরও তার বাড়িতে চুলায় হাঁড়ি বসত না। অন্যকে দান করতে গিয়ে অনেক সময় তিনি ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। একবার সুদসহ ঋণের টাকা আদায় করতে গিয়ে একজন মাড়োয়াড়ী ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে আদালতে দেউলিয়া ঘোষণার মামলা দায়ের করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তা জানতে পেরে মাড়োয়াড়ী ব্যবসায়ীর দাবিকৃত টাকা নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করে রক্ষা করেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে। ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী থাকতেন দিল্লির একটি কুটিরে। ত্যাগের রাজনীতির কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। আব্দুর রাজ্জাক কর্মীবান্ধব নেতা ছিলেন। যার দরুন ১৯৯১-২০১১ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা না হওয়া সত্ত্বেও তার মৃত্যুর পর ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, গুলশানের বাড়িতে, বনানী কবরস্থানে, সংসদ ভবনের জানাজায় শরীয়তপুর বা দক্ষিণ ডামুড্যার মানুষের  স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নেমেছিল। আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার উপেক্ষা আর অবহেলার মধ্য দিয়ে আব্দুর রাজ্জাক ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর লণ্ডনের কিংস হাসপাতালে অন্তিমযাত্রা করেছেন। কিন্তু দেশ-বিদেশের অগণিত নেতা-কর্মী তথা সর্বস্তরের মানুষের হƒদয় থেকে তার সংগ্রামী জীবনের গরিয়ান-মহীয়ান আদর্শকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আজ যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে, দেশে চলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের গভীর ষড়যন্ত্র, সেখানে তার মতো দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদের  প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১১ সালে আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বশান্তি পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত শিক্ষক শহীদ জেসি দেবের সরাসরি ছাত্র। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী রাজ্জাক ভাইয়ের আদর্শ  বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখুকÑ এটাই আমাদের কাম্য। 



২০তম জাতীয় টিকা দিবস উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীনিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পোলিও মুক্ত বাংলাদেশ গঠনের নতুন করে অঙ্গীকার গ্রহণের মধ্যদিয়ে ২০তম জাতীয় টিকা দিবস (এনআইডি) উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শনিবার সকালে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে ৫ বছরের কম বয়সী কয়েকটি শিশুর প্রত্যেককে দু’ফোটা পোলিও ভ্যাকসিন ও একটি করে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০তম এনআইডি’র প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার ভবিষ্যৎ বংশোধরদের জন্য একটি সুস্থ জাতি গঠনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’ স্বাস্থ্য খাতে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদেেপর কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকার ১১ হাজার কমিউনিটি কিনিক পুনরায় চালু করেছেন। এসব কিনিক অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এসব কিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিলো এবং এগুলো এখন জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের রূপকল্প বাস্তবায়নে মোবাইল ফোন এবং টেলিমেডিসিন পদ্ধতির মাধ্যমেও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। হাসিনা বলেন, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তাঁর সরকার সাফল্যের সঙ্গে ভ্যাকসিন অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দেশকে পোলিওমুক্ত করেছিল। তিনি বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এ কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিল এবং সেসময় যথাযথ কর্মসূচির অভাবে পোলিওতে আক্রান্ত হবার কয়েকটি ঘটনাও ধরা পরে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার মতায় আসার পর তাঁর সরকার ৫ বছরের নীচে বয়সী সকল শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং দুই ফোটা পোলিও ভ্যাকসিন খাওয়ানোর মাধ্যমে পুনরায় এ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এছাড়া দুই বছর থেকে পাঁচ বছরের নীচে বয়সী সকল শিশুকে ক্রিমিনাশক ট্যাবলেট দেয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী ৫ বছরের নীচে বয়স এমন সকল শিশু যেন পোলিও ভ্যাকসিন কর্মসূচির আওতায় আসে তা নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ জানান। শেখ হাসিনা শিশুর পাশাপাশি মায়েদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রতি যথাযথ নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, মায়েরা যাতে পুষ্টিকর খাদ্যসহ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন সেদিকে আমাদের সকলকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ল্েয ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে অতি দরিদ্র্য জনগণকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসে সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ ২০১০ সালের জাতিসংঘ এমডিজি-৪ পদক লাভ করেছে। তিনি এ সাফল্যের জন্য ইপিআই কর্মীদের ধন্যবাদ জানান। স্বাস্থ্য সচিব হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: আ ফ ম রুহুল হক, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব:) ডা: মজিবুর রহমান ফকির বক্তৃতা করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী গণভবনের লন থেকে বেলুন উড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি উদ্বোধন করেন। সরকারি সুত্র জানায়, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যরা আজ দেশব্যাপী  বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, বিদ্যালয় এবং বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মত যাত্রী চলাচল এলাকাসহ মোট ১ লাখ ৪০ হাজার কেন্দ্রের মাধ্যমে শূন্য থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে পোলিও টিকা খাওয়াবেন। এছাড়া এ কর্মসূচি চলাকালে ২ কোটি শিশুকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। এ কর্মসূচির দ্বিতীয় দফার কার্যক্রম আগামী ১১ ফেব্র“য়ারি শুরু হবে।
২০১২ হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্য সংগঠনিক ও সম্মেলনের বছর : হানিফ
নিজস্ব প্রতিবেদক
আওয়ামী লীগের জন্য ২০১২ সাল হবে সাংগঠনিক ও সম্মেলনের বছর। এ বছরেই সারা দেশের সকল ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলার ও জেলা সম্মেলন শেষ করে কেন্দ্রীয় সম্মেলন করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। সরকারের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিকল্পনার কথা জানান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ। তিনি বলেন, আগমী মার্চ মাসের মধ্য সারা দেশের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা ও উপজেলা এবং জ্লুাই মাসের মধ্য সারাদেশের সকল সাংগঠনিক জেলাগুলোর সম্মেলন শেষ করা হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ইতমধ্যে প্রতিটি জেলা নেতাদের কাছে চিঠি দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদ উর্ত্তীর্ণ হয়েছে ৫-৬ বছর আগেই। সর্বশেষ ২০০৩ সালের ২৫ জানুয়ারি যুবলীগ, ২০০৩ সালের ২৭ জুলাই স্বেচ্ছাসেবক লীগ, একই বছর ২৯ জুলাই কৃষক লীগ, ২০০৪ সালের ৮ আগষ্ট তাঁতী লীগ, একই বছর ১৫ মার্চ যুব মহিলা লীগ, ২০০০ সালের ১১ মার্চ আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, ২০০৩ সালে ৩ জুলাই শ্রমিক লীগের সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। গঠনতন্ত্র অনুসারে এ সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদ ৩ বছর। দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদ অনেক আগে শেষ হওয়া সত্ত্বেও এখনো কেন সম্মেলন করা হচ্ছেনা, জানতে চাইলে মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, আমাদের সকল সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০০৬ সালের দিকে। ২০০৬ সালে তত্ত্বাধায়ক সরকার ছিল, এ জন্য আমরা কোন সম্মেলন করতে পারিনি। আগামী ২/৩ মাসের মধ্যেই সকল সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিদায়ী বছরে দল এ বিষয়ে অনেক কাজ শুরু করেছিল। যার অনেক গুলোই এখনো শেষ করা যায়নি। নতুন বছরে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে সারা দেশের অনেক ওয়ার্ড, ইউনিয়নের সম্মেলন শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, এ বছরের মধ্যেই এসব সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে নীতিগতভাবে পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের তৃণমূলের অবস্থা জানতে জেলা নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছেন। ইতোমধ্য কয়েক জেলার নেতাদের সাথে তিনি গণভবনে বৈঠক করেছেন। এছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনমত গঠন ও মহাজোট সরকারের তিন বছরের সাফল্য তুলে ধরতে নতুন বছরে জেলাগুলোতে জনসভা করা হবে। এসব সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনমত গঠন ও সরকারের সাফল্য তুলে ধরতে সারা দেশে একই ধরনের কর্মসূচী পালন করবে দলটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন জানান, ২০১০ সালে সারা দেশে দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সফর কর্মসূচী শুরু হয়েছিল। গত বছরে তা শেষ হয়নি। নতুন বছরে এসব কাজ শেষ করা হবে। সঙ্গে থাকবে আরও অনেক নতুন পরিকল্পনা। নতুন বছরে দলের পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন বলেন, সারাদেশে ইতোমধ্যে আমাদের তথ্য ও গবেষাণা কর্মশালা শুরু হয়েছে। সিলেট, চট্রগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে এখনো করা হয়নি, তবে খুব দ্রুতই এ তিন বিভাগে তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক কর্মশালা শুরু করা হবে। তিনি বলেন, এছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড সংগ্রহ করে আমরা প্রতিমাসে উত্তরণ বুলেটিনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবো। এছাড়া সরকারের ৩ বছরের সফলতা নিয়ে ডকুমেন্টরি করবো যাতে এর মাধ্যমে আমরা সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ড জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট 
স্কয়ার প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরী আর নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়ী সংস্থা স্কয়ার গ্র“পের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরী মারা গেছেন। তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। তার ছেলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী বলেন, তিনি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। আজ শুক্রবার রাত নয়টায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে তার মরদেহ দেশে আনা হবে বলে অঞ্জন চৌধুরী জানান। গত ২৭ ডিসেম্বর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। এর আগে তিনি ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্কয়ার গ্র“পের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মুনায়েম বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্যামসন এইচ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর আসে। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্যামসন এইচ চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। স্যামসন এইচ চৌধুরীর জš§ ১৯২৬ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি পাবনার আতাইকুলা গ্রামে। বাবা ছিলেন ডিসপেনসারির মেডিক্যাল অফিসার। স্যামসনও ব্যবসায় আসেন ওষুধ শিল্পের মাধ্যমে। ভারতে পড়ালেখা শেষ করে ১৯৫২ সালে গ্রামে ফিরে ছোটো একটি ওষুধের দোকান খোলেন তিনি। পরে চার বন্ধু মিলে ১৯৫৮ সালে গড়ে তোলেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। স্যামসন এইচ চৌধুরীর অক্লান্ত চেষ্টায় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের পাশাপাশি প্রসাধনসামগ্রী, টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও মিডিয়াতেও বিস্তৃত হয় স্কয়ার। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে স্কয়ারের পণ্য। নামকরণ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে স্যামসন এইচ চৌধুরী বলেছিলেন, এটি চার বন্ধুর প্রতিষ্ঠান। এর লোগোও তাই বর্গাকৃতির। ১৯৫৮ সালে তার সেই ছোট উদ্যোগ আজ বিশাল একটি শিল্পগ্র“পে পরিণত হয়েছে, যার কর্মী সংখ্যা ২৮ হাজারেরও বেশি। স্কয়ার গ্র“পের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক আয় ৬১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই উদ্যোক্তা-শিল্পপতি। তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ চ্যাপটারের চেয়ারম্যান ছিলেন ২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত। শাহবাজপুর টি এস্টেট ও মিউচুয়াল স্ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী।

আইটিসি লাইসেন্স পেল ৬ প্রতিষ্ঠান
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে প্রথমবারের মতো ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) লাইসেন্স হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। বিটিআরসি চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়া আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার ছয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের হাতে এই লাইসেন্স হস্তান্তর করেন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- নভোকম লিমিটেড, ওয়ান এশিয়া-এএইচএলজেভি, বিডি লিংক কমিউনিকেশন লিমিটেড, ম্যাংগো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড, সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড এবং ফাইবার এ্যাট হোম লিমিটেড। বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী ৬ মাসের মধ্যে আইটিসি লাইসেন্সপ্রাপ্তদের কাজ শুরু করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স জমা দেয়াসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া কয়েক মাস আগেই সম্পন্ন হলেও নানা কারণে লাইসেন্স হস্তান্তরে দেরি হয় বিটিআরসির। কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদিত ছয়টি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে ইন্টারনেট আরো সহজলভ্য হবে এবং গ্রাহকরাও সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগের জন্য শুধু একটি সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল। তবে সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে টেলিযোগাযোগসহ অন্যান্য খাত ক্ষতির মুখে পড়ে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত অপারেটররা টেরেস্ট্রিয়াল অপটিক্যাল ফাইবার লাইনের মাধ্যমে পাশের দেশ থেকে টেলিযোগাযোগ কোম্পানির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে। বিটিআরসি মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্স) এ কে এম শহিদুজ্জামান জানান, এই লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ছয় প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি টাকা করে ফি দিতে দিয়েছে। এ লাইসেন্স দেয়ার লক্ষ্যে গত ৩১ মার্চ লাইসেন্সিং গাইডলাইনের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে সরকার। লাইসেন্সিং গাইডলাইনের বিজ্ঞাপনে সর্বোচ্চ তিনটি লাইসেন্স দেয়ার কথা উল্লেখ ছিল। পরে তিনটি লাইসেন্সের পরিবর্তে ছয়টি লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। গাইডলাইন প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নয়টি কোম্পানি ওই লাইসেন্স নেয়ার জন্য বিটিআরসিতে আবেদন করে। প্রকাশিত গাইডলাইনে একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ ছিল। গাইডলাইন অনুযায়ী বিটিআরসি ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে। এই কমিটি গাইডলাইনে নির্ধারিত নির্বাচনের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে আবেদনকারীদের ক্রম তৈরি করে লাইসেন্স দেয়ার সুপারিশ করে। সব প্রক্রিয়া শেষে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আইটিসি লাইসেন্স দেয়ার জন্য চূড়ান্ত করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়।

গুম রাষ্ট্রের কৌশল : অধিকার 
নিজস্ব প্রতিবেদক
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের তৃতীয় বছরে ‘ক্রসফায়ার’ এর নামে হত্যাকাণ্ড কমলেও গুপ্তহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের ‘কৌশল’ বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। ২০১১ সালে অন্তত ৩০টি গুপ্তহত্যা হয়েছে উল্লেখ করে এ সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “অস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবির মুখে রাষ্ট্র এই কৌশল বেছে নিয়েছে।” অধিকারের সচিব আদিলুর রহমান খান শনিবার জানান, তাদের এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন জেলার মানবাধিকার কর্মী ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা উপাত্তের ভিত্তিতে।
এতে অধিকার বলেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার মতায় আসার পর ২০০৯ সালে ক্রসফায়ারের নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১৫৪টি। ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিলো ১২৭। ২০১১ সালে তা কমে ৮৪ তে দাঁড়ায়। তবে গত বছর আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে গুম বা গুপ্তহত্যার ঘটনা। ২০০৯ সালে ২টি গুমের ঘটনার কথা জানা গেলেও ২০১০ সালে হয় ১৮টি। আর ২০১১ সালে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে হতাহতের ঘটনা কমে আসলেও বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় থেকেই ‘গুম’ শব্দটি আলোচনায় আসে।
অধিকাংশ েেত্র দেখা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কখনো ডোবা, কখনো নদীতে এসব ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় মিলেছে, তাদের অনেকেই বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নানা স্তরের নেতা-কর্মী।
অবশ্য র‌্যাব ও পুলিশ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যার অভিযোগ ওঠার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, পত্রিকা পড়ে তিনি গুপ্তহত্যার খবর জেনেছেন। আর পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, গুম-অপহরণ-হত্যা অপরাধীদের কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে তারা এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তিনি এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত একটি ঘটনারও কিনারা হয়নি। অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে প্রতিনিয়ত। এই সময় আইন শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনেককেই আদালতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির না করে থানা হাজতে আটকে রেখে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।” ২০১১ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘নৈরাশ্যজনক’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা কমলেও তা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। পুলিশ কর্তৃক একদল মানুষকে লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৬ বছরের কিশোর শামসুদ্দিন মিলনকে।” এছাড়া সীমান্তে ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানীসহ ৩১ জন বাংলাদেশি প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তরীদের হাতে নিহত হওয়ার পরও ‘দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির’ কারণে বাংলাদেশ তিপূরণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে অধিকারেরর প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, “আওয়ামী লীগের তিন বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছে। ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় যথাক্রমে ২৫১, ২২০, ১৩৫ জন নিহত হন।” টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ছাত্রাবাসের সিট দখল, হল দখল ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকেই এসব সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অধিকার। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ৭১১ জন নারী ধর্ষণ, ৫১৬ জন যৌতুকের কারণে সহিংসতা এবং ৬৭২ জন বখাটেদের যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ‘পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব’ ছাড়াও ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্বৃৃত্তায়ন, আইনশৃংখলা রাকারী বাহিনীর নিস্ক্রিয়তা ও ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার’ কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা যাচ্ছে না।
গত বছর প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করায় এবং মতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠন হামলায় বিরোধী দলের অনেক সভা সমাবেশ পণ্ড হয়ে গেছে উল্লেখ করে অধিকার বলেছে, “প্রতিটি ঘটনার পেছনে মতাসীন দল এবং পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে। ২০১১ সালে সারাদেশে ফৌজদারী কার্যবিধি ১৪৪ ধারা প্রয়োগ করে ১০৩ টি সভা বন্ধ করে দেয়া হয়।” সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনির মাধ্যমে ‘৫১টি রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ের পরিবর্তন’ ঘটানোয় এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। সরকারের তিন বছরের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে অধিকার বলেছে, “গত তিন বছরে এটিই প্রমানিত হয়েছে যে, অগণতান্ত্রিক ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কাঠামো বজায় রেখে শুধুমাত্র একটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত কোনো দলকে শাসন করতে দিলে তা জনগণের কোনো কাজে আসে না।”
নতুন উ
পাদিত ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না 
নিজস্ব প্রতিবেদক 
গত তিন বছরে জাতীয় গ্রীডে  নতুন ভাবে যুক্ত হওয়া দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে সর্বশেষ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েভ সাইটে দেয়া তথ্য ও সরকারী মহলের দেয়া বক্তৃতা বিবৃতির তথ্যে এ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েভ সাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে এ যাবতকালে সর্বোচ্চ ৫১৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ  উৎপাদিত হয়েছিল গত বছর ২৩ নভেম্বর। আর ৫ বছর আগে ২০০৭ সালের ২৯ অক্টোবর দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ৪০৩০ মেগাওয়াট। এ হিসেব অনুযায়ি গত ৫ বছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে  মাত্র ১০৪৪ মেগাওয়াট। সম্প্রতি জ্বালানি খাতের রিপোর্টারদের সাথে মত বিনিময়ের সময় পিডিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতা কোন ভাবেই ৫৩০০ মেগাওয়াটের বেশি নয়। এ থেকে এটা স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, গত ৫ বছরে প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন কোন ভাবেই এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বাড়েনি। সরকরি ভাবে সংবাদ সন্মেলন করে বলা হচ্ছে, গেল ৩ বছরে ২৯০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যোগ হয়েছে। এ রকম অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাহলে কি স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন মতা থেকে আরো প্রায় দেড় হজার মেগাওয়া হারিয়ে গেছে।   
২০০৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঐ বছরের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল ৪০৩৬.৭ মেগাওয়াট। ২০০৯ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ৪২৯৬ মেগাওয়াট। গত ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল ৪৬৯৮ মেগাওয়াট। এর পর ২০১১ সালের সর্বোচ্চ ৫১৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর এর থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা আর সম্ভব হয়নি। চলতি ২০১২ সালে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১ জানুয়ারি  ৫০৩৬ মেগাওয়াট। দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২১০ কিলোওয়াট ঘণ্টা যা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় নিতান্ত কম। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত কম। শুষ্ক মৌসুম শুরু হলে পরিস্থিতির অবনতির আশংকা করা হচ্ছে। অথচ গত ক’বছরে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াটে উঠেছে।
তত্ত্বাবধায়ক না হলে সংলাপে লাভ নেই: মওদুদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সে ফয়সালা না হলে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে কোনো লাভ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সদস্য মওদুদ আহমদ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে সেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরেপক্ষ হবে না। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের ফয়সালা না হলে রাষ্ট্রপতির সংলাপও ফলোপ্রসূ হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকার গত জুনে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর থেকেই বিএনপি আন্দোলন করে আসছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিভাগীয় শহরগুলো অভিমুখে রোডমার্চ কর্মসূচি পালন করছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। এদিকে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় নতুন কমিশন নিয়োগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপের আয়োজন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. জিল¬ুর রহমান। আগামী ১১ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সঙ্গে বসবেন। এই সংলাপের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করে মওদুদ বলেন, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে প্রধানমন্ত্রী তাকে বিতর্কের মধ্যে ফেলেছেন। কারণ নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতা নেই। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নাম সুপারিশ করবেন, রাষ্ট্রপতি কেবল তাতে অনুমোদন দেবেন।’
জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতেই সরকার রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি চরম সংকটে। মুুদ্রাস্ফীতির চাপ অর্থনীতির অঙ্গনে ছায়া ফেলেছে। বর্তমান সরকারের অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার কারণে দেশে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ছাত্রলীগ-জাগপার ৬৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এর আগে মিলনায়তনের সামনে দলীয় পতাকা উত্তোলন ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান। আলোচনা সভার পর হয় শোভাযাত্রা। ছাত্রলীগ-জাগপার সভাপতি সাইফুল আলমের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে শফিউল আলম প্রধান, সহসভাপতি রেহানা প্রধান, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান খান, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম, ছাত্রলীগ-জাগপা সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আলম চৌধুরী আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন।

প্রতারণা ও গণতন্ত্রকে কবর দেয়ার ৩ বছর: ফখরুল
নিজস্ব প্রতিবেদক
মহাজোট সরকার তিন বছরে জনগণের কাছে করা কোনো অঙ্গীকারই বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলে দাবি করেছেন বিএনপির মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সরকারের তিন বছর পূর্তির প্রতিক্রিয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, মহাজোট সরকারের এই তিন বছর ছিল জনগণের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ ও গণতন্ত্রকে ‘কবর’ দেয়ার বছর। সরকারের তিন বছর পূর্তি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সাফল্যের কথা জনগণকে জানাবেন। আমরা মনে করি, তিনটি বছর ছিল দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণার বছর। আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন না ঘটনায় জনগণের কাছে তা হতাশা ও ব্যর্থতার সময় বলে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সরকারের তিন বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আগ মুহূর্তে নয়া পল্টন কমিউনিটি সেন্টারে এক আলোচনা সভায় ফখরুল একথা বলেন। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার সরকার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফখরুল বলেন, সংবিধান সংশোধন করে মহাজোট সরকার গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে দেশকে অন্ধকার সুড়ঙ্গের পথে নিয়ে গেছে। সরকারকে পুরোপুরি ব্যর্থ দাবি করে তিনি বলেন, সরকার তিন বছরে দ্রব্যমূল্য কমাতে পারেনি। জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নতুন সংযোগের অভাবে এই তিন বছরে কোনো বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন হয়নি। ফলে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আশ্বাসও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সরকার স্বীকার না করলেও দেশের অর্থনীতি সঙ্কটে রয়েছে বলে দাবি করেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফখরুল। তিনি বলেন, প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ১৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হচ্ছে সরকারের। ব্যর্থতা ‘ঢাকতে’ বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চলছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি নেতা। দেশের মানুষ আপনাদের আর চায় না। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান, সরকারের উদ্দেশে তার বক্তব্য। নির্বাচন বর্জন বিরোধী দলের ভুল সিদ্ধান্ত হবে-বিসিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ অতীতে যেভাবে স্বৈরাচারের সঙ্গে আঁতাত করে এবং জনগণের সঙ্গে বেঈমানি করে নির্বাচন করেছে। বিএনপি সেভাবে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি নজরুল ইসলামের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বিএনপির মুখপাত্র। ২০০৯ সালে নজরুল নিহত হন। আলোচনা সভায় নজরুলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।

অবৈধ ভবন ভেঙ্গে ফেলার উদ্যোগ রাজউকের
হাসান মাহমুদ রিপন
ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী (বিএনবিসি) নির্মাণকাজ করবে মর্মে ভবন মালিকরা নকশা অনুমোদনকালে রাজউকের কাছে অঙ্গীকার করলেও নির্মাণকালে তারা বিএনবিসির নির্দেশ না মেনে নিজেদের পছন্দমতো কাজ করে। এর ফলে নির্মাণকালে পাইলিং থেকে শুরু করে ভবনের ভিত্তি, কলাম, বিম, ছাদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ধারিত দৈর্ঘ্য প্রস্থ, পুরুত্ব, নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহারে প্রচুর গরমিল করা হয়। পাইলিংয়ের জন্য মাটি কাটলে প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থাও করা হয় না। এ কারণে রাজউকের অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করলেও নির্মাণকালে এবং নির্মিত হওয়ার পর অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। আর বিধির দোহাই দিয়ে বিষয়টি জেনেও নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যায় রাজউক। নগরীর যে সব ভবন মালিক ইতিপূর্বে দেয়া সতর্কতামূলক নোটিশ অগ্রাহ্য করেছেন, তাদের উঁচু ভবনসহ অবৈধ স্থাপনা এবং মূল অনুমোদিত প্ল্যান থেকে সরে এসে নির্মিত ভবনের বাড়তি অংশ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। নিয়ন্ত্রণ কমিটি এ অভিযানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ, রিহ্যাব ও ল্যান্ড ডেভেলপারদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বেশ কয়েকটি মনিটরিং টিমকে নগরীর অননুমোদিত ভবন নির্মাণ সনাক্ত করার কাজে নিয়োজিত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের একজন কর্মকর্তা জানান, নির্মাণ ত্র“টির কারণে সম্প্রতি রাজধানীতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় পাইলিং ধস এবং গুলশান ২-এর পাইলিং ও দেয়াল ধসের ঘটনাসহ এ রকম আরও অনেক ঘটনা ঘটছে এ কারণেই। তিনি জানান, তেজগাঁও শিল্প এলাকার নাখালপাড়ার ৩০৪/ই নং প্লটে নির্মাণাধীন ভবনটির স্থাপত্য নকশার অনুমোদন দিয়েছিল রাজউক। তবে বিস্তারিত কাঠামোগত নকশার ত্র“টির কারণে সেটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। রাজউক সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে একটি মনিটরিং কমিটি একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটকে সঙ্গে নিয়ে নগরীর গুলশান এলাকা পরিদর্শন এবং বেশ কয়েকটি অননুমোদিত ও অবৈধ ভবন সনাক্ত করেছে। এই পরিদর্শক দলে ছিলেন কমিটির সদস্য স্থপতি জালাল আহমেদ, সাংবাদিক মো. এনামুল হক, ম্যাজিস্ট্রেট রোকনউদ্দৌলা, রাজউকের উপ-পরিচালক (নগর পরিকল্পনা) মো. সিরাজুল ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ও মনিটরিং টিমের সদস্য সচিব মো. শফিকুল ইসলাম। নিয়ন্ত্রণ কমিটির দিক-নির্দেশনা ও বিদ্যমান নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অথবা নকশা না মেনে স্থাপনা নির্মাণকারীদের অনেকের কাছেই রাজউক নোটিশ পাঠিয়েছে। পরিদর্শন শেষে মনিটরিং কমিটি রাজউক মহাখালী অফিসে বৈঠক করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করে। মনিটরিং কমিটি নগরীর অননুমোদিত ও অবৈধ ভবন ভেঙে ফেলার লক্ষ্যে তা সনাক্ত করার কাজ শুরু করে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে। নিয়ন্ত্রণ কমিটির দিক-নির্দেশনা ও বিদ্যমান নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অথবা নকশা না মেনে স্থাপনা নির্মাণকারীদের অনেকের কাছেই রাজউক নোটিশ পাঠিয়েছে। কর্তৃপক্ষেক জানানো হয় যে কতিপয় মালিক রাজউকের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে তাদের ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখার কারণে নির্মাণস্থলে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং বাড়ছে সম্পদহানি ও হতাহতের ঘটনা। নিয়ন্ত্রণ কমিটি আইনি পদক্ষেপ এড়াতে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকদের তাদের অবৈধ স্থাপনা এবং ভবনের অননুমোদিত অংশ অপসারণ করে অবিলম্বে রাজউককে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজউকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল হুদা বলেন, আইন ও বিধিমালা মোতাবেক এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজউক কাজ করছে। অনেক অননুমোদিত বা অবৈধ স্থাপনার মালিক মামলা করায় সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তবে রাজউক থেমে আছে, এ অভিযোগ সত্যি নয়। তিনি বলেন, জনবল সংকটের জন্য রাজউক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সামনে জনবল প্রায় তিন গুণ করার চেষ্টা চলছে। তখন কাজের গতি বাড়ানো যাবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তালিকায় ভবন অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও গত এক বছরে তার একটিও ভাঙা হয়নি। মাঝে মধ্যে ভাঙ্গার ধমকি দিয়ে অধিকাংশ সময় নীরব থেকেছে কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ ভবন ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও রাজউক এ ব্যাপারে কার্যকরী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। যেসব ভবনকে অবৈধ তালিকাভুক্ত করার পরও গত একবছরে ভাঙা হয়নি তা হলো- ২৯০/২, পশ্চিম নাখালপাড়ার জনৈক মো. আবদুল কুদ্দুস মিয়ার ভবন, ২৪৩/২ পূর্ব নাখালপাড়ার মো. মোতাহের হোসেনের ভবন, ১৮ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. আবদুস সালাম ডোমিনিওর ভবন, ২৩৮/২/১, পূর্ব নাখালপাড়ার মো. আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারির ভবন, ৬৮৩ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. গেদা মিয়ার ভবন, ২৬১/এ পূর্ব নাখালপাড়ার মো. মাসুদের ভবন, ২৮০ পূর্ব নাখালপাড়ার আবদুল হান্নানের ভবন, একই এলাকার মো. আবু হানিফের ভবন, ২৮৬/২ পূর্ব নাখালপাড়ার হাজী জহিরের ভবন, ৬৭৯ পশ্চিম নাখালপাড়ার হাজী আবদুর রাজ্জাকের ভবন, ৬৭৮ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. নুরুল ইসলাম ভুইয়ার ভবন, ৪৬৬/২ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. আবদুল মান্নানের ভবন, ২৮৯ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. আবদুস সাত্তার সেতুর ভবন, ৪৬/৩ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. শাহজাহানের ভবন, ২৩১/৫ পূর্ব নাখালপাড়ার শেখ শহিদুর রহমানের ভবন, ১০১ পশ্চিম নাখালপাড়ার বিলকিস বেগমের ভবন, ৯৫/এ নাখালপাড়া-তেজকুনী পাড়ার মো. রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন জিবিবি প্রপার্টি (সুফিয়া নীড়) ভবন, ৩০৮ পশ্চিম নাখালপাড়ার মো. মুকুলের ভবন ও ৬৪৬ পশ্চিম নাখালপাড়া মো. মকবুল হোসেনের ভবন। এ ছাড়া গুলশানে ২২ তলা জব্বার টাওয়ার, উত্তরায় ১৪ তলা নাটোর টাওয়ার, গুলশানে অনুমোদনহীন ২০ তলা প্রিমিয়ার স্কয়ার, পরীবাগে অনুমোদনহীন গার্ডেন টাওয়ারসহ আরও ২০টি বহুতল ভবন রাজধানীতে নির্মিত হয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, প্রায় আট মাসে যেসব তালিকাভুক্ত স্থাপনার বিরুদ্ধে রাজউক অভিযান চালায়, সেগুলোর মালিক প্রভাবশালী নন। নকশায় সামান্য পরিবর্তন করে বারান্দা বাড়ানো হয়েছে বা কিছু ত্র“টি ধরা পড়েছে, এমন স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।
এ ব্যাপারে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আবদুল মান্নান জানান, বহুতল ভবনে ধসের ঘটনা নিয়ে আমরা এখন ব্যস্ত রয়েছি। রাজউকের তালিকাভুক্ত নাখালপাড়ার অবৈধ ভবন ভাঙা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ ভবন ভাঙা হবে। এজন্য শিগগিরই উক্ত এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে বলেও তিনি জানান। নাখালপাড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, লোকবল সংকটের কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে অবৈধ ভবন ভাঙার অভিযান। তিনি জানান, যেসব লোক রয়েছে তা দিয়ে রাজউকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাছাড়া ভবন মালিকরা মামলা ঠুকে দিয়েও এ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবুন নাসরিন আহমেদ বলেন, ভবন নির্মাণে স্থাপত্য নকশা ও বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা দুই-ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালাতে রাজউক থেকে শুধু কাঠামোগত নকশা অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাজউকের কাজ শুধু পাস করা নকশা অনুযায়ী নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশে আবশ্যিক উš§ুক্ত স্থান আছে কি না, আর ভবনের বহির্ভাগ পাস করা নকশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না তা যাচাই করা। তিনি বলেন, নির্মাণকাজের ত্র“টির জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক এবং স্থপতি দায়ী হবেন। তবে রাজউকেরও দায়িত্ব আছে মনিটরিং করার। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, আসলে নিজেদের অপারগতাকে ঢাকার জন্যই বিস্তারিত কাঠামোগত নকশার বিষয়ে রাজউক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। কারণ এই নকশা বিশ্লেষণ করে তার যথার্থতা যাচাই করার মতো জনবল রাজউকের নেই। দুর্ঘটনা এড়াতে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারের এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তৎপরতা নেই। এসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নূরুল হুদা বলেন, ভবন নির্মাণকালে বিস্তারিত কাঠামোগত নকশার বিষয়ে রাজউকের তদারকি থাকলে অবশ্যই ভালো হতো। তবে ইচ্ছা থাকলেও রাজউকের সীমিত জনবল দিয়ে তা করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শুধু রাজউকের একার পক্ষে পরিকল্পিত নগরায়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ভবন মালিকদেরও সহযোগিতা করতে হবে। ভবন মালিকরা আইন মেনে চললে কোনো দুর্ঘটনাই ঘটত না বলে মনে করেন তিনি।
কুসিক নির্বাচন একটি দৃষ্টান্ত: সিইসি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) নির্বাচন নিয়ে অনেক কানাঘুষা বা সন্ত্রাস ও আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হলেও কুমিল্লাবাসী নির্বাচনে বিপুলভাবে অংশ নিয়ে একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে এটিএম শামসুল হুদা একথা বলেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচন কুমিল্লাবাসীর জন্য ইতিহাস হয়ে থাকবে। এই প্রথম কুসিকের সব ভোটকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি জানান, নির্বাচনে ৭৫ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। তিনি বলেন, ইভিএমের কিছু ত্র“টির শোনা গিয়েছিল। মানুষের অজ্ঞতা থাকতে পারে, ধীরে ধীরে লোকজন ইভিএম সম্পর্কে জানবে, তখন ঠিক হয়ে যাবে। ইভিএম জাতীয় নির্বাচনেও ব্যবহার করা যাবে বলে তিনি অভিমত দেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার ওপর ভিত্তি করে আগামী নির্বাচন কমিশন ইভিএম চালু রাখবে। এতে ভোট দিতে মানুষের কোনো ঝামেলা হয়নি। এই নির্বাচন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচনে ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা হলেও এতে কোনো অঘটনই ঘটেনি। এটিএম শামসুল হুদা বলেন, নির্বাচনের মধ্যে দায়িত্ব পালনকালে রিটার্নিং অফিসার, ডিসি, এসপি বা সরকারি কর্মকর্তারা প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করেছেন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভোট দেয়ায় কুমিল্লাবাসীকে আমি প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাচ্ছি। কুসিক নির্বাচনে ওয়েবক্যাম ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যে সিসিটিভি ব্যবহার করেছি, তা অন্যের কাছ থেকে ধার করা। এবার আমরা নিজেদের ওয়েবক্যাম ব্যবহার করেছি। সেগুলো পড়ে ছিল। এর ফলে নির্বাচনী ব্যয় কমে গেছে। কেউ অভিযোগ করলে ওয়েবক্যামে ধারণা ভিডিওচিত্র থেকে তদন্ত করা যাবে।

মহাজোট সরকারের তিন বছর পূর্তি
দৈনিক সমকালের জরিপ প্রধানমন্ত্রীর করণীয়

সিরাজউদদীন আহমেদ
দৈনিক সমকাল পত্রিকা ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি মহাজোট সরকারের তিন বছরের সফলতা ও ব্যর্থতাÑসরকার ও বিরোধী দলের করণীয় সম্পর্কে এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। সমকালের জরিপ ছিল সময়োপযোগী, তথ্যবহুল এবং উভয় দলের প্রতি সতর্কবার্তা। জরিপের ফল বিশ্লেষণ করেছেন সমকাল পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক অজয় দাসগুপ্ত। জাতির এক কঠিন মুহূর্তে দৈনিক সমকাল চমৎকার জরিপ প্রকাশ করেছে। আমি সহযোগী সম্পাদক অজয় দাসগুপ্ত ও তার সহকর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। স্বল্প সময় ও স্বল্পপরিসরে তারা সরকারের সঠিক চিত্র তুলে ধরেছেÑ তারা জনগণের কথা বলছে, তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারন করে বলেছেন “তীর থেকে দূরে প্রত্যাশার তরী”। সরকারের মাত্র দুই বছর অবশিষ্ট আছে। এই দু’বছরে কয়েকটি করণীয় নির্ধারণ করেছে জনগণ। জরিপের যথার্থতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা সঠিক হবে না। ৬৪ জেলা ও ৩৫১টি উপজেলায় জরিপ চালানো হয়। জরিপের সময়কাল ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাস। জরিপের ৯৬৫২ জন অংশগ্রহণকারীÑ শহরের ৪৫৭৫, গ্রামে ৫০৭৭ জন। তার মধ্যে নারী ৩৩৮৬ পুরুষ ৪৬২৬ জন।  আমি মনে করি ৯৬৫২ জনই একমাত্র কথা বলেননি। তাদের কণ্ঠে সমগ্র জাতির চিন্তা চেতনা উদ্বেগ দাবি ফুটে উঠেছে। দৈনিক সমকাল সমগ্র জাতির মনের কথা প্রাণের কথা প্রকাশ করেছে। জাতি দৈনিক সমকাল পত্রিকার প্রতি কৃতজ্ঞ। পত্রিকার পেশার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে তারা। আমার মনে হয় বিরোধী দলের চেয়ে সরকারি দলকে জরিপ থেকে বেশী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। জরিপের করণীয় বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জরিপকে টকশো হিসেবে গণ্য না করে তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, শতকরা ৬৫ জন বলেছেন যে, রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। আওয়ামী লীগ ৬০ বছর পুরানা দল। দলে গণতন্ত্র নেই। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল হতে ২০১২ সাল পর্যন্ত সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না। ভারতের কংগ্রেসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা প্রায় বছরই দলের সভাপতি, সম্পাদক ও অন্যান্য নেতাদের পরিবর্তন করে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি ও বিরোধী দলে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। একই ব্যক্তি যুগ যুগ ধরে দলে অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। দল ও জনগণের নিকট তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। দলের মুখপাত্র হিসেবে যুগ্মসচিব কথা বলছেন, কিন্তু তার পরিচিতি নেই। দলের ত্যাগী নেতাদের সুকৌশলে নির্বাসন দেয়া হয়েছে। এক বুক ভরা ব্যথা নিয়ে বিদায় নিয়েছেন জাতীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক। দলের জেলা ও উপজেলা কমিটি নেই, বছরের পর বছর একই কমিটি চলছে। জরিপের সুপারিশ অনুসারে অবিলম্বে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করা উচিত। সংসদ কার্যকর করার জন্য সরকারি দল দায়িত্ব পালন করছে না। কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়ে তারা কণ্ঠভোটে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ও ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগের বিল পাস করেছেন। বিরোধী দল সংসদে আসছে না। তাদের অব্যাহত অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত হচ্ছে। মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভাকে নিয়ে বিগত দুই বছরে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। দলের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জনতার দাবির প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রীর দফতর বদল হয়েছে। কিন্তু তাদের বাদ দেয়া হয়নি। এর ফলে দলের ও দেশের ক্ষতি হয়েছে তা সরকারি উপলব্ধি করতে পারছে না। জরিপের ৫১ ভাগ মন্ত্রিসভার রদবদল চেয়েছে ৩৪ ভাগ আংশিক পরিবর্তন চেয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে ৮৬ ভাগ উত্তরদাতা মন্ত্রিসভার রদবদল চেয়েছে। জরিপের ফলাফলে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান মন্ত্রিসভার ওপর অনাস্থা দিয়েছে জনগণ। জনগণের বিশাল বিজয়কে অদক্ষ মন্ত্রিসভা ধ্বংস করতে পারে না। বাণিজ্যমন্ত্রী-যোগাযোগমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রী দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে, যোগাযোগমন্ত্রী পদ্মা সেতু নির্মাণে ও অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য অর্থমন্ত্রী অনেকটা দায়ী। তিনি জাতির সামনে সেক্সপিয়রের নাটকের কমেডিয়ানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাকে জনগণ দেখতে চায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনেকেই সমালোচনা করছে। তিনি ক্রসফায়ার, গুম হত্যা বন্ধ করতে পারেনি। মন্ত্রিসভায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী। আগামী নির্বাচনে যদি মহাজোট সরকার জয়লাভ করতে চায় তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে অবিলম্বে মন্ত্রিসভার অযোগ্য মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের ও জোটের নেতাদের নিয়ে পুনরায় মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে। শরিক দলকে মন্ত্রিসভায় যথাযথ মর্যাদায় রাখতে হবে। জাপার সভাপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তার দলকে মর্যাদা দিতে হবে। জরিপে সরকারের বিদ্যুৎ ও শিক্ষা খাতে সফলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই দুটি খাতে সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সব সফলতা ম্লান করেছে। দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করেছে ৮৩ ভাগ উত্তরদাতা। তবে আশার কথা দেশের মানুষের এখনো শেখ হাসিনার ওপর আস্থা আছে। ৮ ভাগ লোক বলছে তিনি খুব ভালো করছেন, ৪২ ভাগ বলছেন ভালো করছেন, ৫০ ভাগ লোক বলছেন তিনি ভালো করছেন ৩৬ ভাগ লোক বলছেন তিনি ভালো করছেন না। প্রধানমন্ত্রীর কাজের মূল্যায়নের পক্ষে ৫০ ভাগ লোকের আস্থা আছে। অনেক ব্যর্থতার মধ্যে ৫০ ভাগ লোক বলছে তিনি ভালো করছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যার প্রতি মানুষের এখনো আস্থা আছে, এখনো সময় দুই বছর। এই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সরকারি দলের করণীয়
মানুষ একটু ভালো থাকতে চায়। কিন্তু প্রধান সমস্যা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দরিদ্র লোকের জন্য বিনামূল্যে, অর্ধেকমূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। কাজের বিনিময়ে খাদ্যের কর্মসূচিতে তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ে দলের কর্মীরা দুর্নীতি করছে, টেন্ডারবাজি করছে, নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। তারা বেপরোয়া, প্রধানমন্ত্রী নেতাকর্মী ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। জনগণ কি বলতে চায় তা তিনি জানেন না। তাকে মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে হবে। মনে হচ্ছে তিনি খাঁচায় বন্দি। সারাক্ষণ তাকে দেখা যায়, সভা সমিতিতে ভাষণ দিচ্ছেন। সেখানে জনতা নেই, মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা নেই। আমরা জানি শেখ হাসিনার নিরাপত্তা প্রয়োজন। তিনি বিরোধী দলের নেত্রীর ন্যায় উš§ুক্তভাবে জনসংযোগ করতে পারবেন না। তার পরও তাকে জেলায় জেলায় জনসভায় কর্মিসম্মেলন করতে হবে। তাকে দিনের সকালে গণসংযোগ করতে হবে। বিকেলে দাফতরিক কাজ করবেন। মন্ত্রিসভার অধিবেশন পর্যায়ক্রমে সকল জেলায় করতে হবে। মহাজোট সরকার ঢাকার বাইরে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের দু’বছরে ঢাকার বাইরে কয়েকটা সভা করেছে। বিদ্যুৎ খাতে আঁধার দূর হচ্ছে। সরকারকে ধন্যবাদ। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রে সফলতা ম্লান করেছেন অর্থমন্ত্রী। বারবার বিদ্যুত ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে স্বল্প আয়ের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আগাম বলেছেন, আরো তিনবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হবে। অর্থমন্ত্রীর লাগামহীন কথায় জাতি ক্ষুব্ধ। তিনি যে অর্থনীতিবিদ নন, তা তিনি বারবার প্রমাণ করছেন। তাকে অবশ্যই বিদায় দেয়া প্রয়োজন। সরকারের সাফল্য ধ্বংস করছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কালো হাত প্রত্যেক দফতরে থাবা দিচ্ছে। ৪৪ ভাগ উত্তরদাতা বলছে, দুর্নীতি বেড়েছে, তেমন বাড়েনি বলছে ৩৪ ভাগ। দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর নির্মাণে অর্থায়ন বন্ধ করেছে। একজন ব্যবসায়ীকে যোগাযোগমন্ত্রী করা হয়েছে। তিনি রাজনীতিবিদ নন, তিনি পরিচিত নন, তিনি জনগণের ভাষা  বোঝেন না। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার তাকে চেনে। এমনিভাবে একজন অচেনা ব্যবসায়ীকে যোগাযোগমন্ত্রী করা প্রধানমন্ত্রীর চরম ভুল হয়েছে। মন্ত্রী মন্ত্রণালয়কে ডুবিয়ে বিদায় নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর একডজন উপদেষ্টা রয়েছেন। তারা কি করছেন তা কেউ জানেন না। উপদেষ্টা এইচটি ইমামকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন। তিনি জনপ্রশাসনকে দুর্বল করে রেখেছেন। জনপ্রশাসনে অনেকের পদোন্নতি হয়েছে, অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহার বাস্তবায়নে প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পদোন্নতি, বিদেশগমন ও বাড়িঘর নির্মাণ ছাড়া আমলাদের কোনো উদ্দেশ্য নেই। উপদেষ্টা গহর রিজভীকে কেউ চেনে না, দেশের সঙ্গে সম্পর্কহীন উপদেষ্টাকে দিয়ে তিস্তা নদীর পানির সমস্যা সমাধান হবে না। জনপ্রতিনিধি এবং জনপ্রিয় নেতারা একমাত্র টিপাইমুখ বাঁধসহ তিস্তা নদীর সমস্যা সমাধান করতে পারবে বলে মনে করি। তিন বছরের উপদেষ্টাদের কাজের মূল্যায়ন করে বিদায় দেয়া উচিত। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে অগ্রগতি প্রশংসনীয়। ৫৬ ভাগ উত্তরদাতা অগ্রগতিতে হ্যাঁ বলেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় প্রধানমন্ত্রীর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু তাকে মিথ্যা অভিমানের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন মন্ত্রিসভাকে জনমুখী প্রশাসনগড়তে হবে ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জনপ্রশাসন স্থবির, সরকারি প্রশাসনে গতি আনতে পারেনি। জনপ্রশাসন উপদেষ্টা প্রথম থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে অযোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশাসন চালাচ্ছে। সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রশাসন আন্তরিক নেই। একদল সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘিরে ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। অনেকের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিয়ে সুবিধাবাদীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছে। সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহার বাস্তবায়নের জন্য একদল দক্ষ নিবেদিত কর্মকর্তা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হলেন হবেন একজন যুগ্মসচিব। কিন্তু একজন সচিব এই পদটি দখল করে আছেন। সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা। শিক্ষানীতি প্রশংসিত হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য স্থায়ী শিক্ষা ও শিক্ষক কমিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।
দৈনিক সমকালের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত জরিপের ভিত্তিতে বিশিষ্ট সাংবাদিক অজয় দাসগুপ্তের বাস্তবমুখী বিশ্লেষণের আলোকে সরকার ও বিরোধী দল তাদের করণীয় সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা বাঞ্ছনীয়। বিরোধী দলকে সংসদে গিয়ে তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি  পেশ করতে হবে। হরতাল বাদ দিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। মহাজোট সরকারকে অবিলম্বে নিুলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির ঝুঁকি দূর করা, মন্ত্রিসভা থেকে অযোগ্য মন্ত্রীদের বাদ দেয়া, মহাজোট সহযোগী দল থেকে মন্ত্রী নিয়োগ করতে হবে। দলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে, আগামী দুই বছরের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সমাপ্ত করতে হবে। বিএনপি-জামায়াত জোট মুক্তিযুদ্ধের শক্তি নয়, কাজেই মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে ক্ষমতায় পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাকে সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নিজ দলের ঐক্য সুদূর করতে হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে নির্বাচনী ইস্তেহার বাস্তবায়ন করে জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ সকল কাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে করতে হবে। কারণ তিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী- তিনি দলের নেতা, সংসদ নেতা তিনি প্রধানমন্ত্রী।
এই কাল এই দেশ
অরুণ ব্যানার্জী
দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার নিখিল ভদ্র সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ  করেছেন গত ২৮ ডিসেম্বর। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক আরটিভির অপর্ণা সিংহসহ কয়েকজন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হয়েছেন। কুমিল্লার সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও নাগরিক কমিটির সমর্থিত প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। ছাত্রলীগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন ৪ জানুয়ারি গভীর রাতে ধর্ষিতা হয়েছেন এক নৃত্যশিল্পী ছাত্রী। গত বছরের শেষ দিকে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর প্রেক্ষিতে প্রতি কিলোমিটারে দূরপাল্লার গাড়িতে ১৫ পয়সা করে বেড়েছে। বর্ধিত ফি কমানের দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামায় ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় ২ জন ছাত্রীসহ আহত হয়েছে ১৫ জন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ জানুয়ারি ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমাবেশ পণ্ড করে দিয়েছেন। সাংবাদিকসহ আহত হয়েছে ১২। এই হচ্ছে গত দেড়/দু’সপ্তাহে প্রকাশিত ও আলোচিত খবর। নিখিল ভদ্র ঢাকা প্রেসক্লাবে যাচ্ছিলেন পেশাগত কারণে। প্রেসক্লাবের সামনে রাস্তা পার হতে গিয়ে ঘাতক বিআরটিসির চালকের দ্বারা তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন। তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। পঙ্গুত্বের গ্লানি নিয়ে তাকে অতিবাহিত করতে হবে আজীবন। অবশ্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে তার চিকিৎসা বাবদ ৫ লাখ টাকার চেক তুলে দেয়া হয়েছে তার পরিবারের হাতে। সরকার পক্ষ থেকে প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে তার বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা হবে। প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের আনাচে কানাচে সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে।  এতে আহত, নিহত ও পঙ্গু হচ্ছেন অসংখ্য নারী-পুুরুষ ও শিশু। চালক বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। লক্কড় মার্কা গাড়ি, যান্ত্রিক ত্র“টিযুক্ত গাড়ি, সুষ্ঠুভাবে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও বিআরটিএ এর সার্টিফিকেট নিয়ে জেলা, আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার গাড়ি চলছে। মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বহন তো নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা। কয়েক মাস আগে তারেক মাসুদ ও মিশুক মনির মানিকগঞ্জে সিনেমা শূটিং করতে গিয়ে ঢাকা-আরিচা রোডে নির্মমভাবে নিহত হন। এনিয়ে হয় অনেক প্রতিবাদ। সড়ক অবরোধ। ধ্বনিত হয় ‘নিরাপদ সড়ক’-এর স্লোগান কিন্তু অবস্থায় তেমন হেরফের ঘটেনি। আমরা চলাচলের জন্য উন্নততর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চাই। চাই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইনানুগ ও বাস্তবাসম্মত ব্যবস্থা। প্রয়োজনবোধে আইন সংশোধন করা হোক। শুধু চালক-কন্ডাক্টর ও হেলপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া নয়; বাস মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমরা সাংবাদিক নিখিল ভদ্রের উন্নততর  বিদেশে চিকিৎসার সরকারি প্রতিশ্র“তির দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। চাই তার নিজের ও পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ।
বেসরকারি টিভি চ্যানেল আরটিভির তিন সাংবাদিক লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা-১৫ আসনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের বিরুদ্ধে। ৩ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর মনিপুরী হাইস্কুলে অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে আরটিভির স্টাফ রিপোর্টার অপর্ণা সিংহ, ক্যামেরম্যান সাঈদ হায়দার ও মিরপুর অঞ্চলের প্রতিনিধি ওসমান গনি বাবুল ওই স্কুলে গেলে কামাল মজুমদার এমপি তাদের লাঞ্ছিত করেন। স্কুলের অধ্যক্ষ ফরিদউদ্দীন ও উপাধ্যক্ষ রহিমও তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে গত ৫ জানুয়ারি স্কুল কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়ে তিন শাখার শিক্ষার্থীদের এমপির পক্ষে মানববন্ধন করতে বাধ্য করে। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা দুপুর ২টায় গোল চত্বর থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধনে অংশ নেয়। সাংবাদিকরা হচ্ছেন সমাজের বিবেক। মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। কোনো সাংবাদিক একজন সাংসদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়া সভ্য সমাজের কোনো আচরণবিধিতে পড়ে না। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের তিন সাংসদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কামাল আহমেদ মজুমদারের সঙ্গে সেদিন যুক্ত হয়েছিল ফেনীর জয়নাল হাজারী ও নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানের নাম। সেই কামাল আহমেদ মজুমদার আবার স্বমূর্তিতে আÍপ্রকাশ করবেন তাতে আর বিচিত্র কি? আমরা উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এমপির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই। জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেনÑ এটা আমাদের প্রত্যাশা। পাশাপাশি শাসক দল আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্র মোতাবেক উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেনÑ এটাও আমাদের দাবি। আমরা মনে করি শিষ্টাচারবহির্ভূত একজন দলীয় (তাও আবার ক্ষমতসীন দলের) নেতার আচরণ সংগঠনের ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণœ করেছে। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে ৫ জানুয়ারি। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ হয়েছে। বিএনপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া নাগরিক কমিটির প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু বিজয়ী হয়েছেন। বেসরকারি ফলাফলে বলা হয়েছে ‘হাঁস’ মার্কা প্রতীক নিয়ে ৬৫টি কেন্দ্রে তিনি পেয়েছেন ৬৫ হাজার ৭শ’ ৪০ ভোট। পক্ষান্তরে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত আফজাল খান ‘আনারস’ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৪শ’ ২৯ ভোট। অর্থাৎ মনিরুল হক সাক্কু কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৩০ হাজার ৩শ’ ১১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লার কোনো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাদের মনোনীত প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেনি। এতে অবশ্য দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। তবে সরকার জনজীবনের সমস্যা সমাধানে যেমন ব্যর্থ হয়েছে; তেমনি দলীয় নেতা-কর্মীর আচরণ তথা কর্মকাণ্ডে সিদ্ধান্ত নিতে জনগণ ভুল করে না তা প্রমাণিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা জনগণের সেন্টিমেন্ট উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন তা প্রমাণিত হয়েছে। আরো প্রমাণিত হয়েছে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ভোটাররা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর আচরণ ও অতীত কর্মকাণ্ডকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়।
৪ জানুয়ারি গভীর রাতে সাতক্ষীরায় ঘটে এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। জেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে খুলনা আযম খান কমার্স কলেজের বিবিএর ছাত্রী নৃত্যশিল্পী (১৯) আমন্ত্রিত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমীতে রাত ১১টায় অনুষ্ঠান শেষ হলে তিনি ( নৃত্যশিল্পী) দাবি করেন তার পারিশ্রমিকের টাকা। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান বলেন সংগঠনের জেলা শাখার সেক্রেটারি নাজমুল হুদা পলাশ তাকে ও তার স্বামীকে হোটেলে নিরাপদে পৌঁছিয়ে দেয়ার পরই টাকা মিটিয়ে দেবেন। তদানুযায়ী পলাশ নৃত্যশিল্পী ও তার স্বামীকে মোটরসাইকেলের  পেছনে বসিয়ে হোটেলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে নৃত্যশিল্পীর স্বামী সাহাদ খান সৈকতকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে তাকে তার মধ্যকাটিয়ার মেহেদীবাগ বাসায় নিয়ে যায়। অতঃপর ঘরের দরজা বন্ধ করে পলাশ ও জুয়েল নৃত্যশিল্পীকে ধর্ষণ করে। নৃত্যশিল্পীর চিৎকারে পাড়া-প্রতিবেশীরা থানায় খবর দেয়। রাতে পুলিশ এসে নৃত্যশিল্পীকে বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার করে। ৫ জানুয়ারি দুপুরে নৃত্যশিল্পী থানায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে মামলা দায়ের করেন। এ খবর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক সাতক্ষীরা জেলা কমিটি বাতিল ঘোষণা করেছেন। ঐদিন রাতে পলাশকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ কিন্তু জুয়েল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ ঘটনাটি গত কয়েক দিন যাবৎ ‘টক অব দি কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। যে ছাত্র সমাজ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে একদিন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল, এখন কোথায় সেই ছাত্র সমাজের ইমেজ? অপরাজনীতির অক্টোপাশে ছাত্ররাজনীতি আজ পথ হারিয়েছে। টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এখন ছাত্র রাজনীতির অলিখিত নীতি। আর ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন হলে তো কথাই নেই। আমাদের বড় বড় দলের নীতিনির্ধারকরা দেশে সুষ্ঠু ধারার ছাত্র রাজনীতির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। নতুবা এভাবে ছাত্ররাজনীতির পদ ব্যবহার করে চলতে থাকবে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও সামাজিক জীবনে নৈতিকতাহীন কর্মকাণ্ড। কোনোরকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়েছে সরকার। মাত্র ৫০ দিনের ব্যবধানে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছে লিটার প্রতি ৫ টাকা। এক বছরে ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়েছে ৬ বার। আর ৪ বার বেড়েছে কেরোসিন, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য। সরকার দূরপাল্লার বাস ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১৫ পয়সা বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছে এক টাকা ৩৫ পয়সা। রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে দেশের রুটের বাস ভাড়া দূরত্বভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে যেখানে ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা সর্বোচ্চ নেয়া যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ডিজেলচালিত বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সিএনজিচালিত বাসের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। আর যাত্রীসাধারণ ব্যবহƒত হচ্ছে মালিকপক্ষের ‘বলির পাঁঠা’ হিসেবে। এ ব্যাপারে সরকার ও মালিকপক্ষ জরুরিভাবে বৈঠক করে স্বল্পবিত্ত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের দুর্দশার কথা মাথায় রেখে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমরা আশা করি। মালিকপক্ষ আন্তরিক না হলে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নিলে ভুক্তভোগী যাত্রীসাধারণ উপকৃত হবে। বর্ধিত ফি কমানোর দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল  ৩ জানুয়ারি। এতে হামলা করেছে ছাত্রলীগ। আহত হয়েছে ২ জন ছাত্রীসহ ১৫ জন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৫ জানুয়ারি ঘটেছে একই রকম ঘটনা। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা ‘বীরদর্পে’ হামলা চালিয়ে পণ্ড করে দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট সমাবেশ। এতে আহত হয়েছে ১২ জন। বছরের শুরুতে অশান্ত হয়ে উঠেছে শিক্ষাঙ্গন। কুয়েট, বুয়েট, শাবি ও রাবির ঘটনায় শিক্ষাঙ্গনে বিরাজ করছে অস্থিরতা। অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থীরা চিন্তিত ভয়াবহ সেশনজট নিয়ে। আমরা প্রত্যক্ষ করছি ইতিহাসের গৌরবময় রাজমুকুট মাথায় পরা ছাত্রলীগের ললাটে আজ কলঙ্কের তিলক। আমরা এই অবস্থার অবসান চাই। ছাত্রছাত্রীরা বই, খাতা, কলম নিয়ে লেখাপড়া করবে। তাদের মেধার বিকাশ ঘটাবে। শিক্ষাঙ্গন  থেকে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি তথা সব রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ সোচ্চার হবে। আগামী দিনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ছাত্রলীগসহ সব ছাত্র সংগঠন সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাবেÑ এটাই আমরা আশা করি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে দক্ষ মানবসম্পদ কারিগরি শিক্ষা বিকাশের বিকল্প নেই   
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়ন জরুরি হলেও বাংলাদেশে  মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষার যেমন দ্রুত প্রসার লাভ ঘটছে কারিগরি শিক্ষার বেলায় তেমনটি হয়নি। বর্তমানে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষার অধীনে শিক্ষা গ্রহণরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২.৮ শতাংশ। অথচ জাপানে এ ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত জনবলের শতকরা হার ৬০ ।  দক্ষিণ কোরিয়ায় রয়েছে ৪০% এবং মালয়েশিয়ায় ২৫%। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো  বিকল্প  নেই। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পৃথিবীর উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে  কারিগরি শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং কারিগরি শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে তারা দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।  কারণ  কারিগরি শিক্ষার সাহায্যে স্বল্প সময়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, যে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার যত বেশি সে দেশের মাথাপিছু আয়ও তত বেশি। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে অধিকসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি থাকায় সেখানকার মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৮০০০ থেকে ৪৫০০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি। কিন্তু  বাংলাদেশে মাত্র ২-২.৫ শতাংশ  দক্ষ জনসম্পদ নিয়ে দেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রকৌশলীরা সবচেয়ে বেশি জড়িত। সেবামূলক জরুরি কর্মকাণ্ডেও তাদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি বিদেশে কর্মরত দক্ষ জনশক্তির সিংহ ভাগই ডিপ্লোমা ও স্নাতক প্রকৌশলী এবং তারা সুনামের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে  চাকরি করে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। প্রকৌশলীদের পেশাগত জ্ঞান, কর্মদক্ষতার ওপর যেমনি নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন কাজের মান ও গতিশীলতা তেমনি তাদের ক্রিয়াশীল ভূমিকা গড়ে তোলে দেশের আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধি। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কারিগরি শিক্ষা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আশানুরূপ বিকাশও ঘটেনি দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর। শিক্ষক স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত এবং পুরনো যন্ত্রপাতি, মানহীন পাঠ্যপুস্তক নিয়ে আজ এ শিক্ষা ব্যবস্থার আশানুরূপ বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি। ফলে   দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের  সম্ভাবনা ক্রমশ বিলীন হতে বসেছে। ব্যাহত হচ্ছে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে আসছে। অথচ দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য স্নাতক প্রকৌশলীর পাশাপাশি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও দক্ষ শ্রময়োপযোগী জনশক্তি বিশেষ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই তিন ধরনের পেশাজীবীর গ্রহণযোগ্য অনুপাত ১ঃ৫ঃ২৫ হলেও বাংলাদেশে তা নেই। স্নাতক প্রকৌশলীর অনুপাতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এবং দক্ষ মানের কোর্স সম্পন্নকারী শ্রময়োপযোগী জনগোষ্ঠী রয়েছে আনেক কম। অথচ স্নাতক প্রকৌশলীদের কর্মপরিকল্পনাকে সঠিকভাবে দেখাশোনা ও বাস্তবায়নের জন্য  প্রয়োজন পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা প্রকৌশলী।
বর্তমানে বাংলাদেশে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নির্ধারিত প্রকৌশল বিষয়সমূহ ছাড়াও এ ধরনের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি ডিপ্লোমা, টেক্সটাইল, মেরিন, মেডিকেল টেকনোলজি,  গ্লাস এন্ড সিরামিক্স ও গ্রাফিক আর্টস এসেছে কারিগরি শিক্ষার অধীনে। ৫০-এর দশকের মাঝামাঝি তেজগাঁওয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মধ্যম স্তরের কারিগরি শিক্ষা প্রসারের যে শুভসূচনা হয় ষাটের দশকে তা শিক্ষার প্রসার লাভ করতে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর এ ধরনের পাবলিক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ২০-এ উন্নীত হয়। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় মধ্যম স্তরের ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার জন্য  মোট ৫০টি পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ৬টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট ও একটি সার্ভে ইনস্টিটিউট রয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) পর্যায়ের শিক্ষার জন্য রয়েছে ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ। এ ছাড়া বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিস্তারে রয়েছে ৩৮টি টেকনিকেল ট্রেনিং সেন্টার, ৪০টি টেক্সটাইল ভোকেশনাল কলেজ, ১৩টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রসারে বাংলাদেশে আরো চার হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সিভিল, মেকানিক্যাল পাওয়ার, ইলেকট্রিক্যাল কেমিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ছাড়াও কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড  টেকনোলজি, টেলিকমিউনিকেশনের মতো সময়োপযোগী বিষয়সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। অথচ এসব কোর্সে পাঠদানের জন্য বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। এ ছাড়াও অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ শিক্ষকের অনেক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে এসব শিক্ষায়তনে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। নতুন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেরও তেমন ব্যবস্থা  নেয়া হয়নি।  ২০০১ সাল থেকে প্রকৌশল ডিপ্লোমা কোর্স ৩ বছর থেকে ৪ বছরে উন্নীত করা হলেও নতুন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী প্রণীত পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের ব্যবস্থা হয়নি। ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমে ৬০%-এর বেশি ব্যবহারিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের অভাবে ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনায় এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক জ্ঞান ছাড়াই প্রকৌশল ডিপ্লোমা সনদ নিয়ে বাস্তব জীবনে প্রবেশ করে কর্মক্ষেত্রে নানারূপ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্বনির্ভর, দক্ষ মানব সম্পদসমৃদ্ধ বেকারত্বমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন আনাসহ সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যাপক কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে:
১. বর্তমান বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের জন্য ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায়তনে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেশের মোট শিক্ষার্থীর শতকরা ২০ ভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বিকাশে দেশ-বিদেশের বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে নিত্য নতুন টেকনোলজি চালু করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। ২. দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৫ শতাংশ আত্ম-কর্মসংস্থানে নিয়োজিত রয়েছে। পলিটেকনিক গ্রাজুয়েটদের আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা প্রয়োজন। তাদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করার  জোর তৎপরতা চালাতে হবে। ৩. অদক্ষ জনশক্তির চেয়ে কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী জনবল বিদেশে পাঠাতে পারলে বাংলাদেশে  বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ ২/৩ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশে দক্ষ জনশক্তির প্রসার ঘটাতে ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সারাদেশের বর্তমান কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক মানোন্নয়ন জরুরি। ৪. দেশের বর্তমান কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রতিটি জেলায় আধুনিক মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা প্রয়োজন। সকল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অবিলম্বে শূন্য শিক্ষকের সকল পদ পূরণ এবং নতুন পদ সৃষ্টি করে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগদান করা বিশেষ জরুরি। ৫. চার বছর মেয়াদী প্রকৌশল ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রম অনুসারে পর্যাপ্ত সংখ্যক পাঠ্যপুস্তক এবং ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা ছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষাদান সম্ভব নয়। ৬. তেজগাঁস্থ টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজকে আরো সম্প্র্রসারিত করে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। কারিগরি শিক্ষার্থীদের শিল্প-কারখানায় বাস্তব প্রশিক্ষণকে ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে কারখানা মালিকদের উদ্বুদ্ধ করতে  শিক্ষা বিভাগকে উদ্যোগী হতে হবে। ৭. কারিগরি শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সমন্বয়ে গঠিত মনিটরিং সেলের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল  করা অত্যাবশ্যক। মধ্যম স্তরের প্রকৌশলীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও কাজের সঠিক মূল্যায়নসহ দেশের উন্নয়নের ধারায় তাদের অধিকতর সম্পৃক্ত করা হলে তা দক্ষ জনশক্তি  তৈরিতে সহায়ক হবে যা পক্ষান্তরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার  যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে   বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য  দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য বিধায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশে বর্তমান সরকারের সুদৃষ্টি আশা করে দেশের আপামর জনগণ।

আক্রান্ত সাংবাদিক, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র
ফকির ইলিয়াস
ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন আরেকজন সাংবাদিক। তিনি টিভি চ্যানেল আরটিভির স্টাফ রিপোর্টার অপর্ণা সিংহ। ছাত্র ভর্তির নামে অতিরিক্ত ফি আদায়ের খবর পেয়ে এই টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ঢাকার মিরপুরের মণিপুর স্কুলের মূল ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন। সেখানেই তাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি কামাল আহমেদ মজুমদারের বিরুদ্ধে। আরটিভির বরাত দিয়ে বিভিন্ন ব্লগ, ইউটিউব, মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে সংবাদটি। তাতে দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিক অপর্ণা সিংহ কামাল আহমদ মজুমদারকে বলছেন, ‘আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই’। এটা বলার পরপরই, কামাল আহমদ মজুমদার বলছেন, ‘রাখেন আপনার এইটা’। অর্থাৎ ক্যামেরা দূরে রাখেন। বলেই শুরু হয়ে গেছে ধাক্কাধাক্কি। পরে দেখা গেছে হেনস্তা হয়ে আহত হয়েছেন এই টিভি সাংবাদিক। এখানে লুকানোর কিছু নেই। আজকাল টিভি ফুটেজে অনেক কিছুই ধারণ করা থাকে। এই ঘটনাটিও টিভির কল্যাণে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে- বিদেশে। এদিকে কামাল আহমেদ মজুমদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ওই প্রতিবেদককে সরিয়ে দিয়েছেন মাত্র।
আরটিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক আকতার হোসেন বিভিন্ন মিডিয়াকে বলেছেন, মণিপুর স্কুলে সরকার নির্ধারিত পাঁচ হাজার টাকা ফির সঙ্গে উন্নয়ন ফি হিসেবে ২০ হাজার টাকা আদায় করার প্রতিবাদ করে আসছেন অভিভাবকরা। গেলো মঙ্গলবার সকালে তাদের সঙ্গে স্থানীয় এমপি কামাল আহমেদ মজুমদারের একটি সভা হওয়ার কথা ছিল। আকতার হোসেন জানান, কামাল মজুমদার স্কুলে গেলে অপর্ণা সিংহ তার সাাৎকার নেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় সংসদ সদস্য আমাদের প্রতিবেদককে ধাক্কা দেন। এক পর্যায়ে তার গায়েও হাত তোলেন এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এমপি কামাল মজুমদার অন্যভাবে। অভিযোগ অস্বীকার করে কামাল মজুমদার বলেছেন, অভিভাবক মিটিংয়ে যোগ দিতে স্কুলে গেলে আরটিভির রিপোর্টার তার ক্যামেরাম্যানকে বলেন, ওই লোকটার ছবি তোলো। আমি তাকে সরিয়ে দিয়েছি মাত্র। মারধর কেন করবো? তিনি অভিযোগ করেন, ওই রিপোর্টার অনুমতি ছাড়াই কাসরুমে ঢুকে স্কুলের প্রধান শিককে হুমকি দিয়েছেন। এদিকে ঘটনার পরপরই এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন মাননীয় শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এ ঘটনায় আমি দুঃখিত ও মর্মাহত। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের ঘটনা কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা, গোটা সাংবাদিক সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর প্রতিবাদ ও নিন্দা অব্যাহত রয়েছে দেশে বিদেশে। নারী সাংবাদিক কেন্দ্র এই হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি নাসিমুন আরা হক ও সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা বলেছেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের পেশিশক্তির আক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এই ঘটনার মাত্র কদিন আগে ঘটেছে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছেন দৈনিক কালের কণ্ঠ’র সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল ভদ্র। ঘাতক বাস তাকে চাপা দিয়েছিল। কী হৃদয়বিদারক দৃশ্য! সুস্থ মানুষটি কিছু সময়ের মাঝেই পঙ্গু হয়ে গেলেন! প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জানানো হয়েছে নিখিল ভদ্রকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হবে। এটাই শেষ কথা নয়। কেন এমন হচ্ছে? কেন বাস-ট্রাক ড্রাইভাররা ট্রাফিক আইন মানছে না? নিখিল ভদ্রের এই আহাজারি কিংবা তার জন্য তার পরিবারের কিংবা সতীর্থদের যে কান্না, তার দাম কিভাবে শোধ করবে সরকার?
তিপূরণ দিয়ে সরকার যে কোনো দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। পারবে না। আজ নিখিলের চিকিৎসা করাতে সরকারের প থেকে যে ব্যয় করা হবে, সেটা তো নিখিলেরই অর্থ, সাধারণ মানুষের অর্থ। চালকের ভুলের খেসারত নিখিল বা নিখিলের মতো সাধারণ মানুষ কেন দেবে? বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠানে এমন বাসচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যে ট্রাফিক আইন মানে না। এটা অবশ্যই সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত।
সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা হারিয়েছি তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরের মতো কৃতী মানুষদের। মিরসরাই ট্রাজেডির শোক জাতি ভুলে যায়নি। এবার পা হারিয়েছেন নিখিল ভদ্র। দেশে যেন সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়েই চলেছে। দেশের সব প্রান্তে নিয়মিত ঘটছে দুর্ঘটনা। বেশিরভাগ েেত্রই চালকের ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। নিভে যাচ্ছে কতো জীবনপ্রদীপ। বারবার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে দেশ। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে বলছেনÑ নিরাপদ সড়ক চাই। কিন্তু লাভ হয়নি। কেন হয়নি? কার স্বার্থে হয়নি? স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চেয়ে পথে নেমেছে সাধারণ মানুষ। তাদের চাওয়া পূরণ হয়নি। না হওয়ার প্রধান কারণ দেশের শীর্ষ দুর্নীতি সিন্ডিকেট। যারা যাকে তাকে লাইসেন্স দেয়। ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করেই ওরা গাড়ি চালায়।
তাই এ প্রশ্নটি বারবার আসছে, সরকার কি নিশ্চিন্তে পথে চলার নিরাপত্তাটুকুও দিতে পারবে না সাধারণ মানুষকে? সরকারের প থেকে চালকদের প্রশিতি করার কিংবা ট্রাফিক আইন জোরদার করার উদ্যোগ নেয়ার জোর প্রচেষ্টা করা হবে না? কঠোরভাবে তা পালনের বিধিও কি করার মতা নেই সরকারের শীর্ষ শক্তিধরদের? বাংলাদেশে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হয়েই চলেছেন। সাংবাদিকদের ওপর অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত হামলার ঘটনা প্রতিকারহীনভাবেই ঘটে চলেছে। প্রতি বছরই হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবারই আছে। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর না দিয়ে তাকে শাসানো কিংবা আক্রমণ তো কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না। সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক হামলা ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তপে করতে চাইছে কেউ কেউ। তারা তাদের অপকর্ম ঢেকে দিতে চাইছে গলার জোরে। এ অবস্থার প্রতিকার দরকার। সরকারের এ বিষয়ে বোধোদয় হওয়া দরকার। কারণ কোনো পেশিবাজ আজ আছে, কাল তার পেশি বলীয়ান নাও থাকতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের কলম, সাংবাদিকদের ক্যামেরা জাতির পে আছে, থাকবে চিরঅম্লান। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা ধনী নন। খুব বড় অংকের টাকাও তারা কামাই করেন না। সাংবাদিকদের এমনিতেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করতে হয়। শাসকদের রক্তচক্ষু উপো করে কাজ করতে হয়। তুষ্ট করতে না পারলে নেমে আসে নির্যাতনের যাতনা। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্বৈরশাসনের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনামলেও ঘটছে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, সাংবাদিকতা পেশাও মুক্ত পরিবেশ ফিরে পাবে। না, তা হয়নি। অনেকেই দলবাজি বাড়াতে চেয়েছেন সাংবাদিকদের ঘিরে। প্রকাশ্য বিধিনিষেধ না থাকলেও পেশার ঝুঁকি আজো রয়ে গেছে। মিরপুরের ঘটনা গোটা রাষ্ট্রের জন্য বেদনাদায়ক। এর নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা নেই। এই ঘটনার সুবিচার হোক।
ফকির ইলিয়াস : কবি ও সংবাদিক।